বোরো মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মাগুরা জেলায় জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। জেলার একাধিক ফিলিং স্টেশনে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেন না থাকায় কৃষকসহ সাধারণ ভোক্তারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেক কৃষক কয়েক দিন ধরে পাম্পে ঘুরেও ডিজেল না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। অন্যদিকে খোলা বাজারে বেশি দামে তেল বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। গতকাল বিকেলে সদর উপজেলার বিনোধপুর চৌরাস্তা মোড়ে খোলা বাজারে এক লিটার পেট্রল ১৬০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়।
মাগুরা সদর হাসপাতালের কর্মী আইয়ুব আলী বলেন, “বিভিন্ন পাম্পে ঘুরেও পেট্রল পাইনি। পরে বাধ্য হয়ে খোলা বাজার থেকে বেশি দামে কিনতে হয়েছে।”
সদর উপজেলার মা–ফাতেমা ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান জানান, তাদের পাম্পে পেট্রল ১৯ হাজার ৬০০ লিটার, অকটেন ১৮ হাজার ২০০ লিটার এবং ডিজেল ৩৮ হাজার লিটার সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু কয়েক দিন ধরে সরবরাহ না থাকায় বিক্রি বন্ধ রয়েছে। একই মালিকানার জাগলা এলাকার মেসার্স আরাফাত ফিলিং স্টেশনেও একই অবস্থা বলে জানান তিনি।
সিতারামপুর এলাকার কৃষক কাবিল উদ্দিন (৭৫) বলেন, “৪ বিঘা ২০ শতাংশ জমিতে ধান লাগিয়েছি। গত চার দিন ধরে পাম্পে ডিজেল নিতে আসছি, কিন্তু তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছি। সেচ দিতে না পারলে ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।”
পারনান্দয়ালী এলাকায় অবস্থিত মেসার্স নাহার ফিলিং স্টেশনের মালিক রুবেল মিয়া জানান, তেলের সংকট রয়েছে। তেল ডিপোগুলো চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করছে না। ফলে গ্রাহক সেবা ব্যাহত হচ্ছে।
নারী কৃষি উদ্যোক্তা আয়তুন নেছা বলেন, “কৃষিকাজের জন্য এক লিটার ডিজেল কিনতে এসেছিলাম, কিন্তু পাম্পে তেল নেই। এখন কীভাবে সেচ দেব, বুঝতে পারছি না।”
মেসার্স মনোয়ারা জামান ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার জানান, তাদের পাম্পে বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার ৭০০ লিটার ডিজেল মজুদ আছে, তবে পেট্রল ও অকটেন নেই।
কৃষিকাজের জন্য তেল নিতে আসা বগুরা মাঝাইল এলাকার কৃষক আক্কাস আলী আজ দুপুরে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে অভিযোগ করেন, শহরের আবালপুরে অবস্থিত মেসার্স মনোয়ারা জামান ফিলিং স্টেশন থেকে তাদের পূর্বাশা পরিবহনে তেল দেওয়া হচ্ছে। পাম্পের সামনে রাখা বাঁশের বেষ্টনী সরিয়ে পাম্পে গাড়ি ঢোকানো হচ্ছে। তাদেরকে সঙ্গে সঙ্গে তেল দেওয়া হচ্ছে, আর আমরা কৃষিকাজের জন্য এক লিটার তেল কিনতে এসে তিন-চার দিন দাঁড়িয়ে থেকেও ফিরে যাচ্ছি।
জেলা সূত্রে জানা গেছে, মাগুরা জেলায় মোট ২১টি তেল পাম্প রয়েছে। তবে সরবরাহ কম থাকায় বেশ কয়েকটি পাম্পে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত কৃষি পরিচালক (উদ্যান) প্রকাশ চন্দ্র সরকার বলেন, “মাগুরা জেলায় কৃষি খাতে প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। জমির ধরন ও সেচের ওপর নির্ভর করে এই চাহিদা বাড়তে বা কমতে পারে।” তিনি জানান, জেলায় ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের সংখ্যা প্রায় ২৭ হাজার ৪৯৯টি। প্রতি বিঘা জমিতে সেচ দিতে সাধারণত দেড় থেকে দুই লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়।
এদিকে জ্বালানি তেল সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থাপনা নিয়ে আজ (১৫ মার্চ) দুপুরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ। এ সভায় মাগুরা ফুয়েল সাপ্লাইয়ের মালিক উত্তম কুমার অভিযোগ করেন, জেলার কয়েকটি স্থানে খোলা বাজারের বিক্রেতারা খুলনা ডিপো থেকে নৌকাযোগে তেল এনে মজুদ করে বেশি দামে বিক্রি করছেন।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে সাময়িক সমস্যা তৈরি হলেও ইতোমধ্যে আমদানিকৃত কয়েকটি তেলের জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। বোরো মৌসুমে কৃষকদের প্রয়োজন বিবেচনায় ১৫ মার্চ থেকে জ্বালানি তেল বিতরণে রেশনিংসহ সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়েছে এবং চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ অব্যাহত থাকবে।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মাগুরা জেলায় নিট ফসলি জমির পরিমাণ প্রায় ৮১ হাজার ৭৬২ হেক্টর এবং কৃষি নিবিড়তা প্রায় ২৫৫ শতাংশ। ধান, পাট, মসুর, সরিষা ও পেঁয়াজ এ অঞ্চলের প্রধান ফসল। কৃষকদের মতে, দ্রুত তেল সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে চলতি বোরো মৌসুমে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এএন