বাঙালি জাতির ইতিহাসে ভয়াল ও বিভীষিকাময় কালরাত্রি ২৫ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র ও নিরীহ বাঙালির ওপর ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে ঝাঁপিয়ে পড়ে মেতে উঠেছিল ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞে।
সেইসব বীর শহীদদের স্মরণে এবং ইতিহাসের বর্বরোচিত এই দিনটিকে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের লক্ষ্যে গোপালগঞ্জে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পালিত হয়েছে জাতীয় গণহত্যা দিবস।
বুধবার গোপালগঞ্জ উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন বধ্যভূমির শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, বিশেষ মোনাজাত এবং আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করা হয়। গোপালগঞ্জের আপামর জনতা এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো আয়োজনে দেশপ্রেম ও শোকের এক অনন্য আবহের সৃষ্টি করেছে।
দিবসের কর্মসূচির সূচনা হয় গোপালগঞ্জ উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন বধ্যভূমিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে। সকাল থেকেই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে মুখরিত হয়ে ওঠে বধ্যভূমি এলাকা।
গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান জেলা প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তিনি কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন।
জেলা প্রশাসনের পর গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. হাবীবউল্লাহ জেলা পুলিশের একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় পুলিশের একটি চৌকস দল সশস্ত্র অভিবাদন (গার্ড অব অনার) প্রদান করে শহীদের প্রতি সম্মান জানায়। বিউগলের করুণ সুরে পুরো এলাকায় এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়।
এরপর বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জেলা পরিষদের প্রশাসক শরীফ রফিকউজ্জামান-এর নেতৃত্বে জেলা পরিষদ শ্রদ্ধা নিবেদন করে। একে একে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, জেলা বিএনপি এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।
পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত এবং দেশ ও জাতির শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদ হলরুমে 'গণহত্যা দিবস' উপলক্ষে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সভায় বক্তারা ২৫ মার্চের সেই ভয়াল রাতের প্রেক্ষাপট এবং বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান বলেন, ২৫ মার্চ শুধু একটি তারিখ নয়, এটি বাঙালির আত্মত্যাগের এক জ্বলন্ত দলিল। পাকিস্তানি শাসকরা ভেবেছিল বুলেটের আঘাতে বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে স্তব্ধ করে দেবে, কিন্তু তাদের ভুল ছিল। এই গণহত্যাই আমাদের স্বাধীনতার পথকে ত্বরান্বিত করেছে। তিনি নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
পুলিশ সুপার মো. হাবীবউল্লাহ তার বক্তব্যে বলেন, শান্তিপ্রিয় বাঙালির ওপর যে বর্বরোচিত হামলা সেদিন চালানো হয়েছিল, তার কোনো তুলনা ইতিহাসে নেই। পুলিশ বাহিনীও সেদিন রাজারবাগে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। আমাদের এই চেতনা ধারণ করে সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা শরীফ রফিকউজ্জামান আবেগাপ্লুত কণ্ঠে একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা স্মরণ করেন।
তিনি আরও বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের কালরাত্রির নির্মম হত্যাকাণ্ড ও বিভীষিকাকে হৃদয়ে ধারণ করে দেশপ্রেমের চেতনায় উজ্জীবিত হতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, স্বাধীনতার জন্য আত্মাহুতি দেওয়া শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান এবং ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্যায়ন করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব।
২৫শে মার্চ 'গণহত্যা দিবস' উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
শরীফ রফিকউজ্জামান তার বক্তব্যে মহান মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগ ও বীরত্বের ইতিহাস তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যে বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম জঘন্যতম অধ্যায়। এই নির্মমতাকে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না।
লক্ষ মা-বোনের সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা আমাদের অহংকার। যেখানে তাঁদের সম্ভ্রম ও সম্মানের প্রশ্ন আসে, সেখানে কোনো আপস করা চলবে না।
তিনি উল্লেখ করেন যে, সর্বক্ষেত্রে দেশপ্রেমের স্বীকৃতি প্রদান করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক সম্মান ও ত্যাগের স্বীকৃতি দিলেই আজকের এই আলোচনা সভা সফল ও সার্থক হবে।
তিনি তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস জেনে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে উন্নত বাংলাদেশ গড়তে হবে।
সভায় জেলা পরিষদের অন্যান্য কর্মকর্তা, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা সকলে ২৫শে মার্চের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবি জানান এবং শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
রফিকউজ্জামান বলেন, আমরা যারা যুদ্ধ করেছি, তারা দেখেছি আমাদের ভাইদের কীভাবে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। এই বধ্যভূমিগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় স্বাধীনতার মূল্য কত।
গোপালগঞ্জে পালিত এই দিবসটি কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল এক চেতনার পুনর্জাগরণ। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, পিলখানা, রাজারবাগসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যে তাণ্ডব চালানো হয়েছিল, তার আঁচ পৌঁছেছিল গোপালগঞ্জেও। আজকের এই আয়োজন সেই শহীদদের প্রতি জাতির পক্ষ থেকে এক গভীর কৃতজ্ঞতা স্বীকার।
বক্তারা বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে ২৫ মার্চের এই গণহত্যাকে 'গণহত্যা দিবস' হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। বিশ্বের দরবারে এই নির্মমতার ইতিহাস পৌঁছে দিতে পারলে তা হবে শহীদদের প্রতি শ্রেষ্ঠ সম্মান।
শোক আর শ্রদ্ধার আবহে গোপালগঞ্জে গণহত্যা দিবস পালনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ আরও একবার শপথ নিয়েছে একটি অসাম্প্রদায়িক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার।
বধ্যভূমির শহীদ বেদিতে রাখা একেকটি ফুল যেন বলছিল, তোমাদের এই আত্মত্যাগ আমরা বিফলে যেতে দেব না। যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে দিনের সকল কর্মসূচি সম্পন্ন হয়।
এএন