মরণব্যাধি হামের আতঙ্ক, জীবন বাঁচাতে টিকাকেন্দ্রে উপচে পড়া ভিড়

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি প্রকাশিত: এপ্রিল ৫, ২০২৬, ০৪:১৮ পিএম

আকাশে মেঘের ঘনঘটা নেই, তবুও যেন নীল আকাশ থেকে আচমকা বজ্রপাত নেমে এসেছে ময়মনসিংহের চুরখাই গ্রামে। তবে এই বজ্রপাত প্রকৃতির নয়, এটি এক অদৃশ্য মরণব্যাধি হাম। যার ছোবলে নিভে যাচ্ছে একের পর এক শিশুর প্রাণপ্রদীপ। 

গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়া শিশুমৃত্যুর খবরে এখন চুরখাইসহ আশপাশের জনপদগুলোতে বিরাজ করছে চরম উৎকণ্ঠা। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই রোগটি শিশুকে গ্রাস করে ফেলায় বাবা-মায়ের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। আজ রোববার সকালের আলো ফুটতেই সেই আতঙ্ক রূপ নিয়েছে জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে।

আজ রোববার সকালে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চুরখাই ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা টিকাদান কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায় এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। সকাল পৌনে ৯টা বাজতেই মাদ্রাসার প্রাঙ্গণ জনসমুদ্রে পরিণত হয়। তীব্র রোদেও কোলে সন্তান নিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন শত শত মা। সবার চোখেমুখে একই ভয়—সন্তানকে কি এই ‘মরণব্যাধি’ স্পর্শ করবে?

খবর ছড়িয়েছে, হাম এখন আর সাধারণ জ্বর-কাশির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি দ্রুত সংক্রমিত হয়ে শিশুর জীবন কেড়ে নিচ্ছে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা এবং টিকা না নেওয়া শিশুরা এর প্রধান শিকারে পরিণত হচ্ছে। অভিভাবকদের এই সচেতনতা কেবল স্বতস্ফূর্ত নয়, বরং এটি হারিয়ে ফেলার তীব্র ভয় থেকে উদ্ভূত। বেলা পৌনে ১১টা পর্যন্ত কেন্দ্রে অবস্থান করে দেখা যায়, ভিড় কমার বদলে বেড়েই চলেছে। প্রতিটি অভিভাবকের প্রার্থনা টিকাই যেন হয় তাদের সন্তানের রক্ষাকবচ।

চিকিৎসকরা বলছেন, হামের বর্তমান সংক্রমণ অনেকটা বজ্রপাতের মতোই। কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া এটি হঠাৎ করেই ছড়িয়ে পড়ছে এবং শিশুকে সংকটাপন্ন করে তুলছে। সাধারণত হামে আক্রান্ত হওয়ার পর তীব্র জ্বর ও শরীরে লালচে দানা দেখা দেয়। কিন্তু এবার সংক্রমণের ধরনটি এতটাই তীব্র যে, শ্বাসনালি ও ফুসফুসে সংক্রমণ (নিউমোনিয়া) হতে খুব বেশি সময় নিচ্ছে না। ফলে গ্রামে ছড়িয়ে পড়া মৃত্যুর খবরগুলো দাবানলের মতো আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

চুরখাইয়ের বাসিন্দা জমিলা বেগম, যিনি তার তিন বছরের সন্তানকে নিয়ে এসেছেন, কান্নামাখা কণ্ঠে বলেন, কদিন ধইরা হুনতাছি পাশের গ্রামের ছোট ছোট পোলাপান মইরা যাইতাছে। ডরে রাইতে ঘুম আহে না। এইজন্য হগল কাজ থুইয়া দৌড়াইয়া আইছি টিকা দিতে। আল্লাহ যেন আমাগো ছাওয়ালডারে বাঁচায়া রাখে।

দেশের পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে সরকার আজ রোববার থেকে দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। এই তালিকায় ময়মনসিংহ জেলা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের দাবিদার। জেলার সদর, ত্রিশাল ও ফুলপুর উপজেলাকে সংক্রমণের দিক থেকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে স্বাস্থ্য বিভাগ সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে।

চুরখাই ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় এই জরুরি টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ। তিনি উপস্থিত অভিভাবকদের আশ্বস্ত করে বলেন, “আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, তবে সাবধানতা জরুরি। সরকার প্রতিটি শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। আপনারা শিশুকে কেন্দ্রে নিয়ে আসুন, একটি শিশুও যেন টিকা থেকে বাদ না পড়ে।

ময়মনসিংহ সদরের পাশাপাশি ত্রিশাল ও ফুলপুর উপজেলায় আজ সকাল থেকেই টিকাদান কেন্দ্রগুলোতে ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দেওয়া তথ্য মতে, গত কয়েক সপ্তাহে এই এলাকায় হামের লক্ষণ নিয়ে অসংখ্য শিশু ভর্তি হয়েছে। দুর্গম এলাকাগুলোতে ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম পাঠানোর পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, যারা আগে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়েছিল, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এক শিশু আক্রান্ত হলে তার নিশ্বাসের মাধ্যমে আশপাশের সব শিশু সংক্রমিত হতে পারে। তবে এর সমাধান সহজ সময়মতো টিকা প্রদান। এবারের এই বিশেষ কর্মসূচিতে হামের পাশাপাশি রুবেলা ভাইরাসের টিকাও দেওয়া হচ্ছে, যা শিশুদের স্থায়ী পঙ্গুত্ব ও অকাল মৃত্যু থেকে রক্ষা করবে।

চুরখাইয়ের এই চিত্র কেবল একটি টিকাদান কেন্দ্রের নয়, এটি আজ সারা বাংলাদেশের শঙ্কার প্রতিফলন। যখন কোনো রোগ বজ্রপাতের মতো আঘাত হানে, তখন সম্মিলিত প্রতিরোধই একমাত্র উপায়। চুরখাই ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার লাইনে দাঁড়ানো মায়েদের চোখ যে আশার প্রতিফলন দেখিয়েছে, সেই আশাই পারবে এই মরণব্যাধিকে জয় করতে। প্রতিটি শিশু টিকার আওতায় এলে অচিরেই এই আতঙ্ক কেটে যাবে এবং শিশুরা আবার ফিরে পাবে তাদের চঞ্চল শৈশব।

এই টিকাদান কর্মসূচি কেবল একটি সরকারি পদক্ষেপ নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক বিশাল মরণব্যাধির হাত থেকে রক্ষা করার মহান ব্রত। অভিভাবকদের সচেতনতা আর প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপই হতে পারে এই সংকটের চূড়ান্ত সমাধান।

এএন