ন্যায়বিচারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো জামালপুরের বিচারিক ইতিহাসে। এক নারী চা বিক্রেতাকে অপহরণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের লোমহর্ষক ঘটনায় জড়িত তিন অপরাধীকে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে তাঁদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করা হয়।
জামালপুর জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মুহাম্মদ আব্দুর রহিম এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে এই অপরাধকে "চরম পাশবিক ও সমাজের জন্য হুমকিস্বরূপ" হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন- মো. কালাম (৫০), বুলবুল আহমেদ (৪৫) ও মো. রুক (৪০)।
উল্লেখ্য, দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে মো. কালাম রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত থাকলেও বাকি দুইজন—বুলবুল আহমেদ ও মো. রুক বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। আদালত তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছেন। আসামিরা সবাই জামালপুর শহরের পাথালিয়া নওভাঙার চর এলাকার বাসিন্দা।
মামলার এজাহার এবং আদালত সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী নারী ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের একজন সংগ্রামী সদস্য। জামালপুর শহরের শাহ জামাল মাজার সংলগ্ন এলাকায় একটি খুদে দোকানে চা ও পান বিক্রি করে তিনি তাঁর জীবিকা নির্বাহ করতেন। মাজার এলাকায় আগত মানুষদের কাছে চা বিক্রি করেই চলত তাঁর জীবনযুদ্ধ।
২০২৩ সালের ১৪ মে, রাত তখন গভীর। কাজ শেষে দোকান গোছানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ওই নারী। ঠিক সেই মুহূর্তে অভিযুক্তরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাঁকে অপহরণ করে। নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে আসামিরা পালাক্রমে তাঁর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই পৈশাচিকতায় ভুক্তভোগী নারী মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লে অপরাধীরা তাঁকে মৃত ভেবে বা পরিচয় গোপন করার উদ্দেশ্যে শহরের ফৌজদারী এলাকায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।
পরবর্তীতে স্থানীয়দের সহায়তায় তাঁকে উদ্ধার করা হয় এবং হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এই ঘটনায় ভুক্তভোগীর স্বামী বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলাটি দায়ের হওয়ার পর পুলিশ দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত সম্পন্ন করে চার্জশিট দাখিল করে। বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ ও ডাক্তারি পরীক্ষার রিপোর্ট উপস্থাপন করা হয়। দীর্ঘ শুনানিতে এটি প্রমাণিত হয় যে, আসামিরা কেবল ধর্ষণই করেনি, বরং একটি পরিকল্পিত অপহরণের মাধ্যমে ভুক্তভোগীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল।
আদালত তাঁর রায়ে উল্লেখ করেন যে, নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এ ধরনের জঘন্য অপরাধ নির্মূলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কোনো বিকল্প নেই।
রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) ‘ফজলুল হক‘সাংবাদিকদের জানান, আমরা এই রায়ে সন্তুষ্ট। অপরাধীরা ভেবেছিল দরিদ্র একজন নারীর ওপর অত্যাচার করে পার পেয়ে যাবে, কিন্তু আইন যে সবার জন্য সমান, তা আজ আবারও প্রমাণিত হলো। এই রায় সমাজে একটি শক্তিশালী বার্তা দেবে যে, ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
তিনি আরও জানান, পলাতক আসামিদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে রায় কার্যকর করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
জামালপুরের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই রায় নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীরা একে অন্ধকারে আলোর ঝলকানি হিসেবে দেখছেন। সাধারণ মানুষের মতে, মাজারের মতো জনবহুল এলাকার পাশ থেকে একজন নারীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার সাহস যারা দেখিয়েছে, তাদের এই কঠিন শাস্তি প্রাপ্যই ছিল।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া এবং সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হওয়া বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও বাড়িয়ে দেবে। বিশেষ করে প্রান্তিক ও শ্রমজীবী নারীরা, যারা কর্মক্ষেত্রে বা যাতায়াতের পথে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, এই রায় তাঁদের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি জোগাবে।
অপরাধীরা অপরাধ করে পালিয়ে থাকলেও আইনের দীর্ঘ হাত থেকে রেহাই পায়নি। জামালপুরের এই রায় কেবল তিন ব্যক্তির শাস্তি নয়, বরং এটি নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটি সামাজিক ও আইনি প্রতিবাদ। এখন দেখার বিষয়, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করে কত দ্রুত এই দণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হয়। ন্যায়বিচারের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ করার সাহস কেউ দেখাবে না এমনটাই প্রত্যাশা জামালপুরবাসীর।
এএন