সুন্দরগঞ্জে ৯ কোটি টাকার কাজ ফেলে রেখে ঠিকাদার লাপাত্তা

মো. তৌহিদুর রহমান তুহিন, গাইবান্ধা প্রকাশিত: মে ৯, ২০২৬, ১১:৪০ এএম

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে আট কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য একটি দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্রের নির্মাণকাজ প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। মাত্র ৪০টি কলাম নির্মাণের পর ঠিকাদার ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) কার্যত লাপাত্তা হয়ে গেছেন। এতে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন মজুরি না পাওয়া শত শত শ্রমিক।

অন্যদিকে, আবাদি জমি ছেড়ে দিয়েও আশ্রয়কেন্দ্র না হওয়ায় আসন্ন বন্যায় চরম দুর্ভোগের শঙ্কায় দিন গুনছেন এলাকাবাসী।

সরেজমিনে উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভাটি বোচাগারির পোড়ারচরে (৮নং ওয়ার্ড) গিয়ে দেখা যায়, আশ্রয়কেন্দ্রের নির্ধারিত জায়গায় কেবল বালু ভরাট করা হয়েছে। প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী মানুষের জন্য তিনতলা এবং গবাদিপশুর জন্য একটি একতলা ভবন হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে গবাদিপশুর ভবনের মাত্র ৪০টি কলামের কাঠামো দাঁড় করানো হয়েছে। নির্মাণসামগ্রী যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। পড়ে থাকা মিক্সার মেশিন ও টিউবওয়েলে মরিচা ধরেছে, শ্রমিকদের থাকার ঘরটিও ভেঙে পড়েছে। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকার স্পষ্ট ছাপ পুরো প্রকল্পজুড়ে।

স্থানীয়রা জানান, বন্যাপ্রবণ এই এলাকার বানভাসি মানুষ গবাদিপশু ও পরিবার নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় নিজেদের আবাদি খাস জমি এই প্রকল্পের জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তাদের আশায় গুড়ে বালি।

স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. এন্তাজ আলী বলেন, “এই আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ১২ বিঘা খাস জমি দেওয়া হয়েছে, যেখানে আমরা আবাদ করতাম। এক বিঘা জমিতে এবারও ৪০-৫০ মণ ভুট্টা হয়েছে। জমিগুলো ২০২৪ সালের আগেই ছেড়ে দিয়েছি। এখন একদিকে আমরা ফসল থেকে বঞ্চিত হচ্ছি, অন্যদিকে আশ্রয়কেন্দ্রও হচ্ছে না। সরকার আমাদের মহাবিপদে ফেলেছে।”

আশ্রয়কেন্দ্রের কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরাও পড়েছেন চরম বিপাকে। স্থানীয় বাসিন্দা ও শ্রমিক মো. ফজলু মিয়া (৫৫) বলেন, “২০২৪ সালের দিকে কাজ শুরু হয়, কিন্তু ছয় মাস পরেই তা বন্ধ হয়ে যায়। পিআইও বা ঠিকাদার কেউ আর আসেন না, ফোনও ধরেন না। আমরা ৫-৬ মাস কাজ করে চার-পাঁচ লাখ টাকা মজুরি পাব, সে টাকাও পাচ্ছি না। পিআইও অফিসের লোকজন সৎ হলে আজ এই অবস্থা হতো না, তারা উল্টো ঠিকাদারকে সহযোগিতা করেছেন।”

কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. হাফিজার রহমান বলেন, “বন্যার সময় যদি মানুষ আশ্রয়ই নিতে না পারে, তাহলে জমি দেওয়ার কী দরকার ছিল? সরকারের কাছে দ্রুত কাজ শেষ করার দাবি জানাই।”

কাজের এই বেহাল দশা সম্পর্কে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান উষাণ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “কাজের মেয়াদ শেষ হওয়ায় সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। সে অপেক্ষায় আছি।” তবে কবে কার্যাদেশ (ওয়ার্ক অর্ডার) দেওয়া হয়েছিল, তা তিনি জানাতে পারেননি। শ্রমিকদের পাওনা প্রসঙ্গে দায় এড়িয়ে তিনি বলেন, “তারা হয়তো হেড মিস্ত্রির কাছে কিছু টাকা পাবেন, আমার কাছে নয়।”

কাজটি তদারকির দায়িত্বে থাকা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মশিউর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তার দপ্তরে কয়েক দিন গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, “এই প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য আমার কাছে নেই। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ায় কাজ বন্ধ আছে। আগামী মিটিংয়ে মেয়াদ বাড়ানো হবে।”

এএন