ওমানে স্বপ্নভঙ্গ

একই গাড়িতে নিথর চার ভাই, রাঙ্গুনিয়ায় মাতম

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি প্রকাশিত: মে ১৪, ২০২৬, ১১:০২ এএম
নিহত রাশেদ, সাহেদ, সিরাজ ও শহিদ। ছবি : সংগৃহীত

প্রবাসের তপ্ত মরুভূমিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন ছিল তাঁদের। একজনের নয়, দুইজনের নয়- একে একে চার ভাইয়ের। কিন্তু এক নিমিষেই সেই সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেল ওমানের মাস্কাটের অদূরে এক নিঝুম সড়কে। 

ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকায় একটি ব্যক্তিগত গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার চার সহোদরের নিথর দেহ।

একসঙ্গে চার সন্তানকে হারিয়ে এখন দিশেহারা এক মা, আর শোকস্তব্ধ পুরো রাঙ্গুনিয়া। অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে যারা মরুভূমির দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন, আজ তাঁরাই ফিরছেন কফিনে চড়ে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট: শেষ শপিং আর বাড়ি ফেরার আনন্দ

নিহত চার ভাই হলেন- মুহাম্মদ রাশেদ, মুহাম্মদ সাহেদ, মুহাম্মদ সিরাজ ও মুহাম্মদ শহিদ। তাঁদের বাড়ি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বন্দারাজার পাড়ায়।

পারিবারিক সূত্র জানায়, চার ভাইয়ের মধ্যে দুই ভাইয়ের আগামীকাল শুক্রবার বাংলাদেশে ফেরার কথা ছিল। দীর্ঘ প্রবাস জীবনের ক্লান্তি শেষে স্বজনদের জন্য উপহার আর নিজের জন্য এক টুকরো স্বস্তি নিয়ে বাড়ি ফিরবেন- এই ছিল পরিকল্পনা। 

সেই আনন্দ উদযাপনের অংশ হিসেবেই গতকাল বুধবার রাতে তাঁরা একটি গাড়ি নিয়ে কেনাকাটার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন। ওমানের বারকা এলাকা থেকে তাঁরা মুলাদ্দাহর দিকে যাচ্ছিলেন। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই যান্ত্রিক কোনো ত্রুটি বা অদৃশ্য কোনো ঘাতক তাঁদের চিরতরে থামিয়ে দেয়।

মৃত্যুর আগে সেই শেষ আকুতি

ঘটনার ভয়াবহতা বোঝা যায় নিহতদের একজনের পাঠানো শেষ ভয়েস মেসেজ থেকে। চট্টগ্রাম সমিতি, ওমানের সভাপতি মো. ইয়াসিন চৌধুরীর দেওয়া তথ্যমতে, গতকাল রাত আটটার পর ভাইদের মধ্যে একজন বারকা এলাকায় থাকা তাঁদের এক আত্মীয়কে মোবাইলে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠান। অত্যন্ত দুর্বল কণ্ঠে তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁদের সবার শরীর খুব খারাপ লাগছে। তাঁরা গাড়ি থেকে বের হতে পারছেন না, এমনকি হাত-পা নাড়ানোর শক্তিও পাচ্ছেন না।

মেসেজের সাথে তাঁরা নিজেদের বর্তমান লোকেশনও পাঠিয়েছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, অসুস্থ বোধ করায় তাঁরা চিকিৎসার জন্য মুলাদ্দাহ এলাকার একটি ক্লিনিকের সামনে গাড়ি পার্ক করেছিলেন। কিন্তু গাড়ির দরজা খুলে বের হওয়ার শক্তি বা সময় কোনোটিই তাঁদের হাতে ছিল না।

যেভাবে উদ্ধার হলো মরদেহ

বুধবার গভীর রাতে মুলাদ্দাহ এলাকার একটি ক্লিনিকের সামনে দীর্ঘক্ষণ একটি গাড়ি পার্ক করা অবস্থায় দেখে সন্দেহ হয় দুই প্রবাসী বাংলাদেশির। তাঁরা গাড়ির জানালার কাঁচ দিয়ে ভেতরে চারজনকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তৎক্ষণাৎ ওমান পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ এসে গাড়ির দরজা ভেঙে চারজনেরই মৃতদেহ উদ্ধার করে।

প্রাথমিক আলামত এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে ধারণা করা হচ্ছে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) গাড়ির ভেতরে কোনোভাবে বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস ছড়িয়ে পড়েছিল। বদ্ধ গাড়িতে অক্সিজেন কমে গিয়ে এবং বিষাক্ত গ্যাস নিশ্বাসের সাথে শরীরে প্রবেশ করায় তাঁরা ‘সাইলেন্ট কিলার’ বা নিরব মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে মরদেহগুলো বর্তমানে ময়নাতদন্তের জন্য স্থানীয় হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।

রাঙ্গুনিয়ার বন্দারাজার পাড়ায় শোকের ছায়া

এদিকে ওমান থেকে চার ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদ রাঙ্গুনিয়ার লালানগর ইউনিয়নে পৌঁছালে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। যে বাড়িতে শুক্রবার দুই ছেলেকে বরণ করে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল, সেই বাড়িতে এখন চার ছেলের জানাজা আর দাফনের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।

লালানগর ইউপির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আমির হোসেন বলেন, এই শোক সইবার মতো নয়। একটি পরিবারের চারজন কর্মক্ষম টগবগে যুবক এভাবে মারা যাবে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারছি না। পুরো গ্রাম আজ স্তব্ধ হয়ে আছে। আমরা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করছি যাতে দ্রুততম সময়ে লাশগুলো দেশে ফিরিয়ে আনা যায়।

প্রশাসনের তৎপরতা ও পরবর্তী পদক্ষেপ

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাজমুল হাসান জানিয়েছেন, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ এখনো বিষয়টি প্রশাসনকে জানায়নি, তবে খবর পাওয়ার পর থেকেই তাঁরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। জেলা প্রশাসন এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে লাশগুলো দেশে আনার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

ওমানে বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকেও নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র তৈরির কাজ চলছে। চট্টগ্রাম সমিতি, ওমানের নেতৃবৃন্দ নিহতদের পরিবারের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন এবং স্থানীয় পুলিশের সাথে সমন্বয় করছেন।

প্রবাসীদের জন্য সতর্কবার্তা

এই মর্মান্তিক ঘটনা প্রবাসে থাকা লাখো বাংলাদেশির জন্য একটি সতর্ক সংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওমানের প্রখর গরমে অনেক সময় গাড়ির এসি দীর্ঘক্ষণ চালিয়ে ভেতরে বিশ্রাম নেওয়ার প্রবণতা থাকে।

গাড়ির ইঞ্জিনে ত্রুটি থাকলে বা ধোঁয়া বের হওয়ার পথে বাধা থাকলে বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস গাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়তে পারে। বর্ণহীন ও গন্ধহীন এই গ্যাস নিমিষেই মানুষকে অচেতন করে ফেলে, যা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

রাশেদ, সাহেদ, সিরাজ আর শহিদ- এই চারটি নাম এখন রাঙ্গুনিয়ার মানুষের কাছে এক গভীর বেদনার নাম। প্রবাসে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা এই যোদ্ধাদের এমন করুণ বিদায় কেউ মেনে নিতে পারছে না। এখন সবার একটাই চাওয়া, প্রিয়জনদের শেষবারের মতো দেখার জন্য যেন দ্রুত লাশগুলো মাতৃভূমিতে ফিরিয়ে আনা হয়।

এএন