শীতলক্ষ্যা ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে আবর্জনার স্তুপ, জনদুর্ভোগ চরমে

রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি প্রকাশিত: মে ১৬, ২০২৬, ০৬:৩১ পিএম

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের তারাবো বিশ্বরোড, রূপসী, বরপা, ভুলতা, গোলাকান্দাইলসহ আঞ্চলিক সড়কের পাশে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনার স্তুপ ফেলা হচ্ছে। এছাড়া শীতলক্ষ্যা নদীর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার মুড়াপাড়া, কাঞ্চন, তারাবোসহ ঘাটে ঘাটে ময়লার স্তুপ পাহাড় সমান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে এবং শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানা ও হাট-বাজারের বর্জ্যে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে ময়লা-আবর্জনার স্তুপ ফেলার কারণে পচা দুর্গন্ধে বিপর্যস্ত হচ্ছে পরিবেশ। মহাসড়কে চলাচল ও খেয়াঘাটে শীতলক্ষ্যা নদী পারাপারের সময় পথচারীদের নাকে-মুখে রুমাল ধরতে হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা পড়ছে চরম ভোগান্তিতে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া বাজার, তারাবো বাজার, হাটাবো বাজার, বেলদী বাজার, শিমুলিয়া বাজার, তারাবো পৌরসভা ও কাঞ্চন পৌরসভাসহ শিল্পকারখানা শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে অবস্থিত। এসব শিল্পকারখানা, হাট-বাজার ও পৌরসভার ময়লা-আবর্জনা ফেলার নির্ধারিত স্থান না থাকায় সরাসরি নদীর তীরবর্তী খেয়াঘাটের পাশে স্তুপ করা হচ্ছে। বিশেষ করে মুড়াপাড়া বাজার খেয়াঘাট ও কাঞ্চন বাজারের পৌর পার্কের পাশের নদীর ঘাটে ময়লার পাহাড় জমেছে।

প্রতিদিন পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও বাজারের ময়লা সংগ্রহ করে ভ্যানের মাধ্যমে শীতলক্ষ্যা নদীর খেয়াঘাটে ফেলে যাচ্ছেন। নির্দিষ্ট ডাম্পিং স্পট না থাকায় নদীর খেয়াঘাটে ফেলা এসব আবর্জনা বৃষ্টিতে ধুয়ে আশপাশে ছড়িয়ে পড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মহাসড়ক ও খেয়াঘাটের পাশের এই বর্জ্যের কারণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। নাক-মুখে রুমাল চেপে তাদের যাতায়াত করতে হচ্ছে। বৃষ্টির দিনে আবর্জনার সঙ্গে কাদাপানি মিশে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। ময়লা ও দূষিত পানির কারণে নদীতে গোসল করাও সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিদিন ময়লা ফেলার কারণে সারাক্ষণ উৎকট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আবর্জনার স্তুপে কুকুরের ঘাঁটাঘাঁটি করার ফলে দুর্গন্ধ আরও বেড়ে যাচ্ছে এবং মশার উপদ্রব বাড়ছে। এসব আবর্জনা অপসারণে কর্তৃপক্ষ কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে আশপাশের বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগের মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন।

শীতলক্ষ্যা নদীর খেয়াঘাট ও মহাসড়কের গোলাকান্দাইল এলাকার আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পচা ও উচ্ছিষ্ট খাবার, কলার কাঁদি, নারকেল ও সুপারির বাকল, পরিত্যক্ত বস্তা, প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের খালি প্যাকেটসহ বাসাবাড়ি, হোটেল-রেস্তোরাঁ, হাট-বাজারের গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক বর্জ্য। এসব বর্জ্যে আশপাশের পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। নদীর তীরের বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এবং নদীর স্বাভাবিক গতিপথও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ময়লা-আবর্জনার স্তুপ থেকে মশা-মাছিসহ বিভিন্ন জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে।

এসব বর্জ্যের দুর্গন্ধে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। অসুস্থ হয়ে পড়ছেন নৌকা ও ইঞ্জিনচালিত নৌকার মাঝি ও যাত্রীরা। কাঁচাবাজারের বর্জ্যে সৃষ্ট মশা-মাছির জীবাণু শাকসবজি ও মাছ-মাংসে মিশছে। কাঞ্চন পার্কে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরাও দুর্গন্ধের কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন। শিল্পকারখানা ও হাট-বাজারের বর্জ্যে শীতলক্ষ্যার পানি দূষিত হচ্ছে। এতে নদী তীরবর্তী মানুষ চর্মরোগ, ডায়রিয়া, আমাশয় ও জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে।

কাঞ্চন বাজারের ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম বলেন, “ময়লা ফেলার জন্য নির্দিষ্ট কোনো জায়গা না থাকায় বাসাবাড়ি এবং বাজারের বর্জ্য নদীর তীরে ফেলা হচ্ছে। একটি নির্দিষ্ট জায়গা করে দিলে এই দূষণ হতো না।”

কাঞ্চন পৌরসভার কেন্দুয়া এলাকার শিক্ষক এনামুল হক সিকদার বলেন, “শীতলক্ষ্যা নদী রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় স্থানে আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার বা ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ করতে হবে।”

রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আইভি ফেরদৌস বলেন, “ময়লা-আবর্জনা থেকে ভাইরাসজনিত নানা ধরনের রোগ সৃষ্টি হয়। ময়লার গ্যাসে শ্বাসনালির সমস্যা, চোখে জ্বালা, হাঁপানি, নিউমোনিয়া ও শ্বাসযন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়ে।”

কাঞ্চন পৌর প্রশাসক ও রূপগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ মারজানুর রহমান বলেন, “কাঞ্চন পৌরসভায় ময়লা ডাম্পিং করার জন্য কোনো স্টেশন বা গ্রাউন্ড নেই। এতে পচা দুর্গন্ধ ও বর্জ্যের কারণে দুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে। অবিলম্বে ময়লা ডাম্পিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে।”

তারাবো পৌর প্রশাসক ও রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “তারাবো পৌরসভায় ময়লা ডাম্পিং ব্যবস্থা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। তবে নদীর ঘাটে ময়লার স্তুপ ফেলা উচিত নয়। সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে এবং প্রয়োজনীয় স্থানে আরও ডাম্পিং ব্যবস্থা করতে হবে।”

এএন