ঈদুল আজহার বাকি মাত্র আর কয়েকদিন। বাসা-বাড়ি ও খামারে কোরবানির পশুর প্রতি নেওয়া হচ্ছে বাড়তি যত্ন। অন্যদিকে বাঁশ বা কাঠ দিয়ে গরু বেঁধে রাখার নির্দিষ্ট স্থান বা বেড়ার জন্য গুনতে হচ্ছে পৃথক টাকা। তার ওপর খাজনা গরু প্রতি ৬০০ টাকা এবং ছাগল ২০০ টাকা। যে কারণে প্রতিটি গরুতে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা বাড়তি দাম চাইতে হচ্ছে বিক্রেতা বা গরুর বেপারীদের। ফলে বেশিরভাগ ক্রেতা দাম বেশি অজুহাতে ফিরে যাচ্ছেন খালি হাতে। আবার অনেক ক্রেতা অভিযোগ করছেন- গত বছর কোরবানির এই বাজারে কোনো হাসিল দিতে হয়নি।
ইজারামুক্ত বাজার হঠাৎ ইজারা দেওয়া হয়েছে শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেন অনেকেই। এ চিত্র ঝালকাঠি জেলার সুগন্ধিয়া বাজারের। শাহাদাত হোসেন অপু এই বাজারের ইজারা নিয়েছেন বলে জানা গেছে। তার সহযোগী হাসিল আদায়কারী বলেন, আমরা এই হাটের নিরাপত্তা যেমন নিশ্চিত করেছি, তেমনি রয়েছে ব্যাংকিং সুবিধা। এছাড়াও নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা রয়েছে। তাছাড়া হাসিলতো আগেও ছিল।
যদিও আড়াই বাধার বিনিময়ে গরুর বেপারীদের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ এড়িয়ে যান তারা। তবে ক্রেতাদের অনেকেই শতবর্ষী এই বাজারে এসে খালি হাতে ফিরে যেতে চাননি। ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার মধ্যে বেশ কিছু গরুর বেচাকেনা চাক্ষুষ হলো দু’ঘন্টার ব্যবধানে।
ঝালকাঠি জেলার সদর উপজেলার বিনয়কাঠী ইউনিয়নের সুগন্ধিয়া গ্রামে এই হাটের অবস্থান হলেও এর বেশিরভাগ ক্রেতা বরিশাল সদর উপজেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা। কেননা বরিশাল সদর উপজেলার রায়াপাশা-কড়াপুর ইউনিয়নের সীমানা ঘেঁষেই এই বাজারের অবস্থান। মাঝখানে বয়ে গেছে কালিজিরা নদী, যা বর্তমানে আকারে ছোট হয়ে খালে পরিণত হয়েছে এবং এই খালের ওপর সংযোগ সেতু তৈরি করে বরিশালের কড়াপুর ও ঝালকাঠির সুগন্ধিয়া গ্রামের সম্পর্ক যুগ যুগ ধরে বহমান রয়েছে।
ইজারামুক্ত হাট হওয়ার কারণে বিগত বছরগুলোতে এখানে বেচাকেনায় কোনো টোল বা হাসিল বা খাজনা দিতে হতো না। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেই এই হাটের পুনরায় ইজারা দেওয়ায় চারদিকে চলছে সমালোচনার ঝড়। শুধু এই সুগন্ধিয়াই নয়, বরিশালের হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জের বেশ কিছু ইজারামুক্ত বাজার পুনরায় ইজারা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে প্রশাসনের বিরুদ্ধে।
এদিকে কোরবানির পশুর চাহিদা অনুপাতে বরিশাল অঞ্চলে অতিরিক্ত উৎপাদন রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিভাগীয় ও জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তারা। তাদের থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় চলতি বছর মোট পশুর হাট বসছে ৩২৮টি।
এর মধ্যে বরিশাল জেলায় ও সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, এবার মহানগরীসহ বরিশাল জেলায় কোরবানি উপলক্ষে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ৭৯টি পশুর হাট। যার মধ্যে বরিশাল সিটিতে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ৩টি অস্থায়ী পশুর হাট। তবে স্থায়ী এবং অস্থায়ী মিলিয়ে এবার জেলায় মোট পশুর হাটের সংখ্যা ৯৩টি।
ঝালকাঠিতে মোট গরুর হাট বসানো হয়েছে ৪১টি। এর মধ্যে স্থায়ী হাট রয়েছে ১৯টি। এসব হাটের মধ্যে অন্যতম একটি ঐতিহাসিক হাট হচ্ছে সুগন্ধিয়া। কালিজিরা নদীতীরবর্তী এই হাটে প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার অন্যান্য পণ্যের পাশাপাশি হাজারো পশুর বেচাকেনা হয়।
পিরোজপুরে মোট কোরবানির হাট ৫৫টি, যার মধ্যে ১৯টি স্থায়ী হাট রয়েছে। পটুয়াখালী জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে স্থায়ী ও অস্থায়ী পশুর হাটের সংখ্যা প্রায় ৪৭ থেকে ৬৪টির মতো। বরগুনা জেলায় কোরবানির পশুর জন্য মোট ৪৬টি পশুর হাট বসেছে, যার মধ্যে ১৭টি স্থায়ী এবং ২৯টি অস্থায়ী। ভোলা জেলায় ৭ উপজেলায় সর্বমোট ৯৩টি পশুর হাট রয়েছে, যার মধ্যে ৫৬টি স্থায়ী এবং ৩৬টি অস্থায়ী।
হাটগুলোতে কোরবানি যোগ্য এবং মানসম্মত পশু বিক্রির বিষয়টি নিশ্চিত করতে বিভাগের ছয় জেলায় মোট ১৩৬টি ভেটেরিনারি মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র বরিশাল জেলায় ৩১টি ভেটেরিনারি মেডিক্যাল টিম গঠন করেছে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ। দুটি হাটের জন্য একটি করে টিম কাজ করছে বলে জানা গেছে। এছাড়া বরিশাল সিটি এলাকার স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে চারটি হাটে কাজ করছে সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ।
বরিশাল বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মাহফুজুল হক বলেন, এ বছরে বিভাগের ছয় জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে ৪ লাখ ৩২ হাজার ৬১১টি। বিভাগের ২৬ হাজার ৫৭৮ জন খামারি ও কৃষকের কাছে মজুত রয়েছে ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৪৫৪টি। এতে করে চাহিদা মেটানোর পরেও উদ্বৃত্ত থাকবে ১৬ হাজার ৮৪৩টি পশু।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বরিশাল জেলায় কোরবানির পশুর প্রয়োজন ১ লাখ ১২ হাজার ৯৪৭টি, মজুত রয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৫৫৭টি; ঝালকাঠি জেলায় ৩১ হাজার ১৯টির বিপরীতে রয়েছে ৩১ হাজার ১১৪টি; পিরোজপুরে ৪১ হাজার ২৫০টির বিপরীতে রয়েছে ৪৬ হাজার ৪৯৭টি; পটুয়াখালীতে ১ লাখ ২৩ হাজার ২১০টির বিপরীতে রয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৭৪১টি; বরগুনায় ৩২ হাজার ২৩১টির বিপরীতে মজুত রয়েছে ৩৮ হাজার ৯৫টি; ভোলায় ৯১ হাজার ৯৫৪টির বিপরীতে মজুত রয়েছে ৯২ হাজার ৪৫০টি। সব মিলিয়ে বাইরে থেকে না আসলেও পর্যাপ্ত কোরবানির পশু রয়েছে বরিশাল অঞ্চলে।
এএন