৬৭ দিনে মাগুরায় অপরাধ দমনে দৃশ্যমান পরিবর্তন

মিরাজ আহমেদ, মাগুরা প্রকাশিত: মে ৩১, ২০২৬, ০২:৫৯ পিএম

মাত্র ৬৭ দিনের ব্যবধানে মাগুরা জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস মিলছে। মাদকবিরোধী অভিযান, ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার, চুরি-ডাকাতি দমন এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক তৎপরতার মাধ্যমে আলোচনায় এসেছে মাগুরা জেলা পুলিশ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, জেলার চারটি থানায় সমন্বিত অভিযান এবং মাঠপর্যায়ে তদারকি বৃদ্ধির ফলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।

২০২৬ সালের ২৫ মার্চ মাগুরার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মোল্লা আজাদ হোসেন, পিপিএম-সেবা। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি মাদক, চুরি, ডাকাতি ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে জোর দেন। জেলা পুলিশের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২৫ মার্চ থেকে ২৯ মে পর্যন্ত পরিচালিত বিশেষ অভিযানে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ দমনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাওয়া গেছে।

জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ৬৭ দিনে মাদকবিরোধী অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে ১ হাজার ২৫০ পিস ইয়াবা, প্রায় ৪৫ কেজি গাঁজা, ৯৮ বোতল ফেনসিডিল, ৭১ বোতল দেশীয় মদ, ৪৫ বোতল বিদেশি মদ এবং ৩৩ গ্রাম হেরোইন। এ সময় মাদক-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মামলায় একাধিক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, জেলার বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি এবং তথ্যভিত্তিক অভিযান পরিচালনার ফলে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে।

চুরি ও ডাকাতির ঘটনায় দ্রুত তদন্ত এবং অভিযান পরিচালনা করে চোরাই মোটরসাইকেল, মোবাইল ফোন, নগদ অর্থসহ বিভিন্ন মালামাল উদ্ধার করেছে পুলিশ। জেলার আলোচিত কয়েকটি ডাকাতির ঘটনার রহস্য উদঘাটন এবং জড়িতদের গ্রেপ্তার করাও জেলা পুলিশের সাম্প্রতিক সাফল্যের অন্যতম দৃষ্টান্ত।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি সময়ে চুরি-সংক্রান্ত ৮টি মামলায় অভিযান পরিচালনা করে একাধিক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং উদ্ধার করা হয়েছে চোরাই মালামাল। এর মধ্যে একটি কালো রঙের ছাগল ও নগদ অর্থও উদ্ধার করা হয়েছে।

জেলার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাতেও দৃশ্যমান অগ্রগতি এসেছে বলে দাবি পুলিশের। সংশ্লিষ্ট সময়ে ৪২৪টি প্রসিকিউশন দাখিলের মাধ্যমে ১৬ লাখ ৬৮ হাজার ৪০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল মাত্র ২ লাখ ৬৮ হাজার ৭০০ টাকা।

পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং যানবাহন চলাচলে নিয়ম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

অস্ত্র উদ্ধার কার্যক্রমেও জাতীয় পর্যায়ে সাফল্যের স্বীকৃতি পেয়েছে মাগুরা জেলা পুলিশ। ২০২৫ সালে জেলায় দায়ের হওয়া ২৮টি অস্ত্র মামলায় ৩৪ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সময়ে উদ্ধার করা হয় ১৮টি ওয়ান শুটার গান, একটি একনলা বন্দুক, ৭টি পিস্তল, ৩টি রিভলভার, একটি এয়ারগান, একটি ম্যাগাজিন, ৫২টি দেশীয় অস্ত্র এবং ১৬৬ রাউন্ড গুলি।

এই সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬’-এ অস্ত্র উদ্ধার ক্যাটাগরিতে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে মাগুরা জেলা পুলিশ।

জেলা পুলিশের তৎপরতায় সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় দিবস, বাংলা নববর্ষ এবং ধর্মীয় উৎসবগুলো শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপিত হয়েছে। স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজ, পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান এবং জেলার বিভিন্ন ঈদগাহ ও মসজিদে ঈদের জামাত কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে।

আসন্ন ঈদুল আজহায় জেলার গুরুত্বপূর্ণ পশুর হাট, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং মহাসড়কে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নিয়মিত টহল, বিশেষ চেকপোস্ট এবং গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে যেকোনো ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

মাগুরার পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন বলেন, “মাদক, সন্ত্রাস, চুরি-ডাকাতিসহ সব ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশের অবস্থান আপসহীন। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না। জনগণের সহযোগিতা নিয়ে একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও অপরাধমুক্ত মাগুরা গড়ে তুলতে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি।”

তিনি আরও বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষা শুধু পুলিশের একার দায়িত্ব নয়। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা থাকলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হবে। জনবান্ধব পুলিশিংয়ের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জনই আমাদের অন্যতম লক্ষ্য।”

জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশি তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক পরিবর্তনের অনুভূতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মাদকবিরোধী অভিযান, ওয়ারেন্ট তামিল এবং চুরি-ডাকাতি দমনে পুলিশের সক্রিয়তা সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ বাড়িয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধ দমনে ধারাবাহিক অভিযান, কার্যকর গোয়েন্দা তৎপরতা এবং কমিউনিটি পুলিশিং একসঙ্গে কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে দীর্ঘমেয়াদে আরও ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব। সেই বিবেচনায় মাগুরা জেলা পুলিশের সাম্প্রতিক কার্যক্রম জেলার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গত ৬৭ দিনের পরিসংখ্যান বলছে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মাগুরা জেলা পুলিশ নতুন গতি অর্জন করেছে। এখন সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এবং অপরাধমুক্ত নিরাপদ মাগুরা গঠনের লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হয়, সেদিকেই তাকিয়ে জেলার বাসিন্দারা।

এএন