চরাঞ্চলের মানুষের টেকসই উন্নয়ন, পুনর্বাসন ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে চর বিষয়ক পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন এবং জাতীয় বাজেটে আলাদা বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদ। একই সঙ্গে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নীতিমালা প্রণয়নেরও দাবি জানানো হয়েছে।
সোমবার দুপুরে কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু।
লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, কুড়িগ্রাম দেশের অন্যতম বৃহৎ চরাঞ্চল অধ্যুষিত জেলা। জেলায় প্রায় ৪ শতাধিক চর রয়েছে, যার মধ্যে আড়াই শতাধিক চরে মানুষের স্থায়ী বসবাস। এসব চরাঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন, দারিদ্র্য, যোগাযোগ সংকট এবং মৌলিক নাগরিক সুবিধার অভাবে অবহেলিত ও বঞ্চিত জীবনযাপন করছে।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে কুড়িগ্রামে প্রায় এক লাখ মানুষ নদীভাঙনের কারণে গৃহহীন হয়েছে। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো শুধু বসতভিটাই হারায়নি, হারিয়েছে জীবিকা, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তাও। প্রতিবছর নতুন নতুন পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়ে অনিশ্চিত জীবনের মুখোমুখি হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জাতিসংঘের অভিবাসন বিষয়ক সংস্থা International Organization for Migration (IOM)–এর তথ্যমতে, প্রতিবছর ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে কুড়িগ্রাম জেলার অন্তত পাঁচ হাজার পরিবার অভ্যন্তরীণ স্থানান্তরের শিকার হয়। এ ছাড়া গত পাঁচ বছরে নদীভাঙনের কারণে প্রায় দুই হাজার পরিবার স্থায়ীভাবে ঢাকা, ঠাকুরগাঁও ও পার্বতীপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে গেছে।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, শুধু কুড়িগ্রাম নয়, দেশের ৩২টি জেলার প্রায় ১০০টি উপজেলার চর ও নদীতীরবর্তী এলাকায় প্রায় দুই কোটি মানুষের বসবাস। এই বিপুল জনগোষ্ঠী কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ ও জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও উন্নয়নের মূলধারা থেকে এখনো অনেকটাই বিচ্ছিন্ন।
সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। চরবাসীর উন্নয়নকে সাধারণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে নয়, বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে নেদারল্যান্ডস, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য কার্যকর পুনর্বাসন ব্যবস্থা চালু করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো মানুষের জন্য এখনো কোনো স্থায়ী ও সমন্বিত নীতিমালা নেই।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল হক রুবেল বলেন, চরাঞ্চলের উন্নয়নকে আর প্রান্তিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নদীভাঙন শুধু ভূমি হারানোর ঘটনা নয়, এটি একটি মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট। শিশুরা শিক্ষার সুযোগ হারাচ্ছে, মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। তাই চরাঞ্চলের উন্নয়ন ও পুনর্বাসনের বিষয়টি জাতীয় অগ্রাধিকারে আনতে হবে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে চর বিষয়ক পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন, জাতীয় বাজেটে চরাঞ্চলের জন্য আলাদা ও স্থায়ী বরাদ্দ, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নীতিমালা এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানে বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণসহ সাত দফা দাবি উত্থাপন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ খাজা শরীফ উদ্দিন রিন্টু, সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ শাহ আলম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইয়েদ আহমেদ বাবু এবং নারী ও শিশু বিষয়ক সম্পাদক নাজমুন নাহার বিউটিসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
জেএইচআর