মাগুরায় ৭.৫ কিলোমিটার জার্মান পতাকা প্রদর্শন নিয়ে বিতর্ক

মিরাজ আহমেদ, মাগুরা প্রকাশিত: জুন ১০, ২০২৬, ০৬:০৮ পিএম

আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে জার্মান ফুটবল দলের সমর্থনে ৭.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মান পতাকা প্রদর্শনের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে মাগুরায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। আয়োজকদের দাবি, এটি খেলাধুলার প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হলেও স্থানীয়দের একটি বড় অংশ এটিকে অপ্রয়োজনীয় অপচয়, অতিরঞ্জন এবং জাতীয় প্রতীকের মর্যাদা নিয়ে বিতর্ক তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

বুধবার সকালে মাগুরা পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোড়ামারা গ্রামের বাসিন্দা মো. আমজাদ মোল্লার উদ্যোগে নিশ্চিন্তপুর বাজার এলাকায় এ উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তবে সরেজমিনে দেখা যায়, ব্যাপক জনসমাগমের প্রত্যাশা থাকলেও উপস্থিতি ছিল সীমিত মাত্র ২০-৩০ জন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মূলত সাংবাদিক, আয়োজক পক্ষের লোকজন ও অল্পসংখ্যক দর্শনার্থী।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বিদেশি দলের পতাকা নিয়ে বাড়াবাড়ি ধরনের কর্মকাণ্ড চলছে। তাদের মতে, খেলাধুলার প্রতি সমর্থন প্রকাশ করা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা হলেও তা নিয়ে অস্বাভাবিক প্রচারণা কিংবা বিশাল আকারের পতাকা তৈরির উদ্যোগ বাস্তব জীবনের প্রয়োজনীয়তা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

স্থানীয় কয়েকজন সচেতন নাগরিক বলেন, “একটি জাতীয় পতাকা শুধু কাপড় নয়, একটি স্বাধীন দেশের মর্যাদা, ইতিহাস ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। সেটিকে অতিরঞ্জিতভাবে ব্যবহার করা বা মূল নকশা ও স্বাভাবিক কাঠামোর বাইরে নিয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।”

তারা আরও বলেন, সম্প্রতি এলাকাটিতে গ্রুপিং সংঘাত ও সহিংসতায় বহু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রশাসন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উদ্যোগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। এমন সময়ে এলাকার উন্নয়ন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সম্প্রীতির মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার পরিবর্তে বিদেশি পতাকা নিয়ে আলোচনায় মেতে ওঠা অনেকের কাছেই অগ্রাধিকারবিহীন কর্মকাণ্ড বলে মনে হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, জার্মানির জাতীয় পতাকার মর্যাদা রক্ষায় দেশটির আইনেও স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। জার্মান সংবিধানের ২২ নম্বর অনুচ্ছেদে কালো, লাল ও সোনালি রঙের পতাকাকে রাষ্ট্রীয় পতাকা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জার্মান দণ্ডবিধির ৯০এ ধারায় জাতীয় পতাকা বা রাষ্ট্রীয় প্রতীকের অবমাননা, বিকৃতি কিংবা অসম্মানজনক ব্যবহারকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে আয়োজক মো. আমজাদ মোল্লা বলেন, “আমি নিজের উদ্যোগে প্রতিটি বিশ্বকাপেই এমন আয়োজন করি। এটি নতুন কিছু নয়। খেলাধুলার প্রতি ভালোবাসা থেকেই এসব করি।”

তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, ৭.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পতাকা তৈরির মাধ্যমে আসলে কী বার্তা দেওয়া হচ্ছে এবং এর সামাজিক প্রয়োজনীয়তা কতটুকু। তাদের মতে, কোনো দেশের পতাকা ব্যবহার করতে হলে সেই দেশের জাতীয় প্রতীকের মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতি সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।

মাগুরার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) শাশ্বতী শীল বলেন, “বিষয়টি এইমাত্র অবগত হলাম। সার্বিক বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।”

মাগুরার পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন বলেন, “বিষয়টিতে কিছু অসংগতি রয়েছে কি না, তা যাচাই করে দেখা হচ্ছে।”

স্থানীয় সচেতন মহলের অভিমত, খেলাধুলা মানুষকে আনন্দ দেয় এবং সম্প্রীতি গড়ে তোলে। তবে সেই ভালোবাসা যেন অপচয়, সামাজিক বিভাজন কিংবা কোনো দেশের জাতীয় প্রতীকের মর্যাদা নিয়ে বিতর্কের কারণ না হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্বশীল থাকা প্রয়োজন।

এএন