ভুট্টার ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে চুয়াডাঙ্গায় সোনালি আঁশ পাটের ঐতিহ্য কিছুটা ম্লান হলেও চলতি মৌসুমে ঘুরে দাঁড়িয়েছে জেলার পাট চাষ। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবার চুয়াডাঙ্গায় পাটের আবাদ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তবে আবাদ বাড়লেও আবহাওয়া, পোকার আক্রমণ এবং জাগ দেওয়ার পানিসংকট নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন স্থানীয় চাষিরা।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫-২০২৬ পাট চাষ মৌসুমে জেলায় মোট ৮ হাজার ৯৯৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ হয়েছে ৯ হাজার ১৩৫ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ গত ২০২৪-২০২৫ মৌসুমে চাষ হওয়া ৮ হাজার ৯৯৫ হেক্টরের বিপরীতে এবার ১৪০ হেক্টর বেশি জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্রে জানা গেছে, জেলার চার উপজেলার মধ্যে সর্বাধিক পাট চাষ হয়েছে দামুড়হুদা উপজেলায়। এই উপজেলায় ৪ হাজার ১১৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জন হয়েছে ৪ হাজার ১৩৮ হেক্টর। আলমডাঙ্গা উপজেলায় ২ হাজার ৫৭২ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে চাষ হয়েছে ২ হাজার ৮৬৫ হেক্টর, জীবননগর উপজেলায় ১ হাজার ৫৮৮ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে চাষ হয়েছে ১ হাজার ৬২০ হেক্টর এবং সদর উপজেলায় ৪২০ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে চাষ হয়েছে ৫১২ হেক্টর।
বিগত এক দশকে চুয়াডাঙ্গা জেলায় পাটের আবাদ ও উৎপাদনে বেশ কিছু উত্থান-পতন দেখা গেছে। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা ও চাষিদের মতে, কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় বিগত বছরগুলোতে চাষিরা পাটের চেয়ে ভুট্টা ও শাকসবজি চাষে বেশি ঝুঁকেছেন। ফলে বর্তমানে জেলার প্রধান অর্থকরী ফসলের স্থানটি ভুট্টার দখলে চলে গেছে। তা সত্ত্বেও এবার পাটের ফলন ভালো ও বাজারে যৌক্তিক দাম পাওয়ার আশায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে পাটের আবাদ করেছেন কৃষকরা।
স্থানীয় কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে প্রতি বিঘা (৩৩ শতক) জমিতে পাট চাষ, সার, কীটনাশক, নিড়ানি, কাটা ও জাগ দেওয়াসহ প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বিঘাপ্রতি গড়ে ৮ থেকে ১২ মণ পাট উৎপাদিত হয়ে থাকে। গত ২০২৪-২০২৫ মৌসুমে বাজারে পাটের দাম ভালো ছিল এবং চাষিরা মণপ্রতি সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম পেয়েছিলেন। তবে চলতি মৌসুমে আবহাওয়া ও পোকার আক্রমণের কারণে কৃষকদের কীটনাশক বাবদ উৎপাদন খরচ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
আবাদ বাড়লেও চুয়াডাঙ্গার পাট চাষিদের গত এক দশক ধরে সবচেয়ে বড় যে সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তা হলো জাগ দেওয়ার পানিসংকট। মূলত বর্ষার শুরুতে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় চুয়াডাঙ্গার স্থানীয় খাল-বিল ও জলাশয়গুলোতে প্রয়োজনীয় পানি থাকে না। তাছাড়া ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে জমির প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলায় ক্রমশ কমছে জলাধার। ফলে নদী বা দূরবর্তী পুকুরে কৃত্রিমভাবে পানি সেচ দিয়ে অথবা ‘রিবন রেটিং’ (আঁশ ছাড়ানো) পদ্ধতিতে পাট পচাতে গিয়ে কৃষকদের বাড়তি শ্রম ও বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, যা তাদের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কৃষি-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যদি সময়মতো পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হয় এবং চাষিরা পাটের ন্যায্য মূল্য পান, তবে চুয়াডাঙ্গায় সোনালি আঁশের এই সুদিন আগামীতেও বজায় থাকবে।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাসুদুর রহমান সরকার জানান, চুয়াডাঙ্গা প্রকৃতিগত কারণে পাট চাষের জন্য উপযোগী নয়। কারণ এখানে পাট পচানোর জন্য যথেষ্ট জলাধার নেই। তবে জেলায় প্রচুর পান চাষ হওয়ায় পাটের প্রয়োজন হয়। সে কারণে চাষিদেরও পাট চাষের আগ্রহ থাকায় এ বছর পাট চাষ বেশি হয়েছে।
এএন