বর্ষা এলেই কক্সবাজারে ফিরে আসে পাহাড়ধসের আতঙ্ক। বছরের পর বছর একই ধরনের দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটলেও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না থাকায় থামছে না মৃত্যুর মিছিল। প্রতিটি ঘটনার পর প্রশাসনের দৌড়ঝাঁপ, ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সতর্কতা ও আশ্বাস দেখা গেলেও কিছুদিন পর সেই তৎপরতা স্তিমিত হয়ে পড়ে। ফলে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গারা আবারও একই ঝুঁকির মধ্যে জীবন কাটাতে বাধ্য হন।
রোববার টানা বৃষ্টির মধ্যে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও স্থানীয় জনপদ মিলিয়ে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই গতকাল সোমবার সকালে কক্সবাজার শহরের দরিয়ানগর এলাকায় পাহাড়ধসে একই পরিবারের একজন নিহত হন। একের পর এক এ ধরনের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় লাখ লাখ পরিবার এখনও ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। বিশেষ করে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা বসতি, পাহাড়ের পাদদেশে নির্মিত ঘরবাড়ি এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বহু আশ্রয়কেন্দ্র ভূমিধসের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিলেই এসব এলাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা খালি করার নির্দেশ দেন এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। কিন্তু কিছুদিন পর সেই কার্যক্রম আর দৃশ্যমান থাকে না। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে স্থায়ীভাবে পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগও বাস্তবায়িত হয় না। ফলে জীবিকার তাগিদে মানুষ আবারও পাহাড়ঘেঁষা বসতিতে ফিরে আসে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, অপরিকল্পিত বসতি, পাহাড় কাটা, বন উজাড় এবং কার্যকর নজরদারির অভাব পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, পাহাড়ে স্থাপনা নিয়ে প্রশাসনের কোনো নজরদারি নেই। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকার পরেও প্রশাসনের টনক নড়ে না। ভারী বৃষ্টি হলে প্রশাসনের যে মায়াকান্না শুরু হয়, সেটা যদি সারা বছর থাকত, তাহলে মানুষের মৃত্যুর মিছিল আর হতো না।
কেবল উদ্ধার অভিযান বা দুর্ঘটনার পর সাময়িক তৎপরতা নয়, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে স্থায়ী পুনর্বাসন, অবৈধ পাহাড় কাটা বন্ধ, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা উন্নত করা এবং নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত না করলে প্রতি বর্ষাতেই এই প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি ঘটবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে টানা বৃষ্টির কারণে জেলার আরও বেশ কয়েকটি পাহাড়ি এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নতুন করে ভারী বর্ষণ হলে আরও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন।
সার্বিক বিষয়ে জেলা প্রশাসক জানান, এ ধরনের মৃত্যু যেন আর না হয়, সেটার জন্য জেলা প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবক ও সিপিপিসহ সবাই মিলে মাইকিং করছে এবং মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছে। তিনি আরও জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিহতদের পরিবারকে আরআরআরসি (RRRC)-এর পক্ষ থেকে এবং স্থানীয়ভাবে নিহত তিনজনের পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, এই বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালকের সরকারি মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
জেএইচআর