দুই হাত নেই, পা দিয়ে লিখে মাস্টার্স পাস করলেন শারীরিক প্রতিবন্ধী নারী! শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে দূরে ঠেলে দিয়ে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার অজপাড়াগাঁয়ে বড় হওয়া নিলা খাতুন এই অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। জন্মগতভাবে দুটির মধ্যে একটি হাত তাঁর নেই, অন্যটি দুই আঙুলবিশিষ্ট ছোট হাত। কিন্তু এই শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনোই নিলা খাতুনকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। তাঁর অদম্য মানসিক ইচ্ছাশক্তি ও কঠোর পরিশ্রমের ফলে তিনি মাস্টার্স শেষ করেছেন।
নিলা খাতুন কামারখন্দ উপজেলার ২ নম্বর ঝাঐল ইউনিয়নের চর বড়ধুল গ্রামের ওসমান গণির মেয়ে। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি বাবা-মায়ের একমাত্র কন্যাসন্তান। জন্ম থেকেই দুই হাত না থাকলেও ছোটবেলা থেকেই তিনি পায়ের সাহায্যে লেখা, খাওয়া, পোশাক পরা এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজসহ পরিবারকে সব ধরনের কাজে সহযোগিতা করে আসছেন।
তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় গ্রামের চর বড়ধুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, সেখানে পঞ্চম শ্রেণি পাস করেন। এরপর চর বড়ধুল দাখিল মাদ্রাসা থেকে জেডিসি ও দাখিল, কামারখন্দ সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা হতে আলিম ও ফাজিল এবং সিরাজগঞ্জের আহমেদ আলী কামিল মাদ্রাসা হতে কামিল (মাস্টার্স) পাস করেন। নিলা খাতুন প্রমাণ করেছেন, মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও কঠোর পরিশ্রমই সব প্রতিকূলতা জয় করে সাফল্যতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে।
নিলা খাতুন বলেন, আমি প্রতিবন্ধী মেয়ে, আমি পা দিয়ে লিখে মাস্টার্স পাস করেছি। ছোটবেলায় যখন অন্যরা হাত দিয়ে লিখত, আমার তো হাত নেই তাহলে আমি কীভাবে লিখব? আমি কান্না করতাম, তখনও আমি থেমে থাকিনি। ভাইয়ারা বড় বড় অক্ষরের খাতায় লিখে রাখত, আমি সেখানে পা দিয়ে লেখার চেষ্টা করতে থাকি। সেই থেকে আমার লেখা-পড়া শুরু, শেষ পর্যন্ত মাস্টার্স। আমি এত কষ্ট ও টিউশনি করে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছি, আমার স্বপ্ন একজন শিক্ষিকা হব।
তিনি আরও বলেন, আমি শিক্ষিকা হলে আমার ছাত্র-ছাত্রীরা আমাকে দেখে অনুপ্রেরণা পাবে। কারণ আমি হাত ছাড়া পা দিয়ে লিখে মাস্টার্স অর্জন করেছি এবং তাদেরকে পা দিয়ে লিখে পড়াশোনা শেখাব। আমি সাংবাদিকদের মাধ্যমে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে দাবি জানাই, আমার শিক্ষাগত ও মেধার যোগ্যতা অনুযায়ী একটা সরকারি চাকুরির ব্যবস্থা করে দিন। আমি তো অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছি, বাবা-মা তো চিরকাল বেঁচে থাকবেন না, আমার তো একটা ভবিষ্যৎ আছে।
নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিলা খাতুন বলেন, আমার সমবয়সী বান্ধবীদের তো বিয়ে হয়ে গেছে। আমার চাকরি নেই, বাবারও আর্থিক টাকা-পয়সা নেই আমাকে বিয়েসাদি দেওয়ার। একটা যদি চাকরি হতো তাহলে বিয়ে হতো, আমার একটা সংসার হতো। আমারও সংসার করার অনেক ইচ্ছে হয়। তাই সরকারের কাছে আবেদন, ওনারা যেন আমার একটা চাকুরির ব্যবস্থা করে দেন। আমি যেন নিজে টাকা ইনকাম করতে পারি। যেহেতু আমি প্রতিবন্ধী কেউ এমনি বিয়ে করবে না, আমি যদি একটা চাকরি করি তাহলে কেউ বিয়ে করবে।
মা শাহিনুর বেগম বলেন, ছোটবেলা থেকেই মেয়েটার পড়াশোনার খুব ইচ্ছা ছিল। আমরা যতটুকু পেরেছি পাশে থেকেছি। এখন শুধু চাই, ওর যোগ্যতার মূল্যায়ন হোক।
অসুস্থ বাবা ওসমান গণি বলেন, দিনমজুরি করে মেয়েকে পড়িয়েছি। এখন সরকারের কাছে একটাই আবেদন, মেয়ের মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন করে একটি চাকরির সুযোগ দেওয়া হোক।
স্থানীয় প্রতিবেশীরা বলেন, নিলা খাতুন ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছিলেন। শুধু একজন শিক্ষিত নারী নন, তিনি অসংখ্য মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা। একটি চাকরি হলে ভবিষ্যৎ নিয়ে ওর পরিবার ও আমরা প্রতিবেশীরা একটু স্বস্তি পাব। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, ওর যেন একটি সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।
কামারখন্দ উপজেলার সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আব্দুল মোতালিব বলেন, নিলাকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ (ইউএনও) আমরা দেখতে গিয়েছিলাম। তাকে সমাজসেবা থেকে সহযোগিতা করা হচ্ছে। সম্প্রতি সমাজসেবা অধিদপ্তরে একটি চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হয়েছে, সেখানে আবেদন করলে নিশ্চয়ই তার ভালো কিছু হতে পারে।
জেএইচআর