রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের আলোকদিয়া উত্তরপাড়া (জামে মসজিদের আগে) গ্রামের বাসিন্দা জাকির হোসেন শেখ। একসময় স্বাভাবিকভাবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করলেও মেরুদণ্ডে বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের পর তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে গেছে। শারীরিক অক্ষমতার কারণে এখন আর আগের মতো কোনো কাজ করতে পারেন না তিনি। অন্যদিকে তার স্ত্রীও দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। অসুস্থ স্বামী-স্ত্রীর এই পরিবারটি বর্তমানে চরম অভাব-অনটন, চিকিৎসা সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে।
সরেজমিনে আলোকদিয়া উত্তরপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, জাকির হোসেনের বসতঘরটি অত্যন্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। টিন ও কাঁচা ঘরের একপাশ ভেঙে পড়েছে। ঘরের বারান্দার এক পাশে রান্নার জ্বালানি কাঠ রাখা রয়েছে। অন্য পাশে মাটির ওপর ছেঁড়া একটি পাটির ওপর শুয়ে ছিলেন তার অসুস্থ স্ত্রী। ঘর থেকে কিছুটা দূরে একটি টয়লেট থাকলেও সেটির কোনো ছাউনি নেই। পলিথিন দিয়ে চারপাশ কোনোরকমে ঘিরে সেটি ব্যবহার করা হচ্ছে।
জাকির হোসেনের স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। তিনি স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারেন না। একটি ভাঙা লাঠির সাহায্যে চলাফেরা করেন। দিনের বেশিরভাগ সময়ই তাকে জরাজীর্ণ ঘরের বারান্দায় শুয়ে কাটাতে হয়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “বাবা, খুব কষ্টের মধ্যে আছি। অনেক সময় দুপুরে কী রান্না করবো, কী খাবো- সেটাও জানি না। শরীর ভালো না, হাঁটতেও পারি না। আমাগের কোনো সন্তানও নাই। আল্লাহর ওপর ভরসা কইরে দিন পার করতেছি। কেউ যদি একটু সাহায্যের হাত বাড়াইত, তাইলে অনেক উপকার হইত।”
জাকির হোসেন জানান, মেরুদণ্ডে অস্ত্রোপচারের পর থেকে তিনি ভারী কোনো কাজ করতে পারেন না। সংসার চালানোর একমাত্র অবলম্বন হিসেবে তিনি জামালপুর রেলস্টেশনের পাশে একটি ছোট্ট দোকান পরিচালনা করেন। সেখানে পান, সুপারি, জর্দা ও অল্প কিছু সিগারেট বিক্রি করেন।
তিনি বলেন, “আগের মতো কাম করতে পারি না। শরীর আর সায় দেয় না। এই ছোট দোকানটাই এখন আমার ভরসা। মানুষের কাছ থেকে ২০০–৩০০ টাকা নিয়ে পান-সুপারি কিনে আনি। সারাদিন বসে বিক্রি করি। দিন শেষে ৩০–৪০ টাকার মতো লাভ হয়। এই টাকা দিয়ে সংসার চালানো, আবার ওষুধ কেনা খুব কষ্ট হয়ে যায়।”
তিনি আরও জানান, তার প্রতিদিন প্রায় ১৮৩ টাকার ওষুধ লাগে। কিন্তু সীমিত আয়ের কারণে অনেক সময় নিয়মিত ওষুধ কেনাও সম্ভব হয় না।
সরেজমিনে দেখা যায়, জামালপুর রেলস্টেশনের পাশে তার দোকানটিও অত্যন্ত ছোট ও অস্থায়ী। চারটি খুঁটির ওপর টিন বসিয়ে কোনোরকমে দোকানটি তৈরি করা হয়েছে। চারপাশে কোনো বেড়া নেই। স্থানীয়দের ভাষ্য, বাজারের কয়েকজন মানবিক ব্যক্তি তাকে বসার জন্য এই দোকানটি তৈরি করে দিয়েছেন।
স্থানীয় বাজারের এক ব্যবসায়ী আব্দুল হালিম বলেন, “জাকির ভাইয়ের অবস্থা খুবই কষ্টের। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি নিজের চেষ্টায় বাঁচার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এই সামান্য আয়ে তার চিকিৎসা ও সংসার কোনোটাই ঠিকমতো চলে না। সমাজের বিত্তবান মানুষ ও প্রশাসনের উচিত তার পাশে দাঁড়ানো।”
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “জাকিরের ঘরের অবস্থা দেখলে যে কারও মন খারাপ হবে। একটি নিরাপদ ঘর ও চিকিৎসার ব্যবস্থা হলে অন্তত তাদের কষ্ট কিছুটা কমবে।”
এদিকে বাজারের এক ক্রেতা ও স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “দেশে এত উন্নয়নের কথা বলা হয়, কিন্তু আমাদের আশপাশে জাকির হোসেনের মতো অনেক মানুষ এখনো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। একটি ঘর, দুবেলা খাবার আর চিকিৎসার জন্য মানুষকে যদি এভাবে সংগ্রাম করতে হয়, তাহলে সমাজের অসহায় মানুষদের জন্য আরও বেশি উদ্যোগ নেওয়া দরকার। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, সাধারণ মানুষের এমন দুরবস্থা দূর করাই হওয়া উচিত তাদের প্রধান লক্ষ্য।”
তিনি আরও বলেন, “জাকিরের মতো অসহায় পরিবারগুলোকে খুঁজে বের করে সরকারি সহায়তার আওতায় আনা প্রয়োজন। শুধু উন্নয়নের কথা নয়, মানুষের জীবনমানের পরিবর্তনও নিশ্চিত করা জরুরি।”
জাকির হোসেন ও তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সময় তারা নিজেদের জীবনের কষ্ট, অসুস্থতা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তাদের চোখের জল ও অসহায়ত্বের চিত্র উপস্থিত সবাইকে ব্যথিত করে।
এ বিষয়ে জামালপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান খায়রুল ইসলাম আমার সংবাদ-কে বলেন, “আমি বিষয়টি জানতে পেরেছি। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে জাকির হোসেনের বাড়িতে যাব। তার অবস্থা দেখে কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
এ বিষয়ে বালিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করা হলে সরেজমিনে তদন্ত করে প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা হবে। সরকারি নীতিমালার আওতায় কোনো ধরনের সহায়তা দেওয়ার সুযোগ থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, জাকির হোসেন ও তার অসুস্থ স্ত্রীর জন্য জরুরি ভিত্তিতে সরকারি সহায়তা, চিকিৎসা, নিরাপদ বাসস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সহযোগিতার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
অসুস্থ শরীর, ভাঙা ঘর, সামান্য আয়ের ছোট্ট দোকান আর সীমাহীন দুশ্চিন্তা- এই নিয়েই চলছে জাকির হোসেন ও তার স্ত্রীর জীবনসংগ্রাম। তাদের মতো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এখন সমাজ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মানবিক দায়িত্ব।
এএন