লালমনিরহাটে চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের তীব্র অবকাঠামোগত সংকট ও দীর্ঘদিনের বিচারক স্বল্পতার কারণে বিচারপ্রার্থী মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। আদালতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় মামলার শুনানি ও নিষ্পত্তি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষকে ন্যায়বিচারের আশায় দিনের পর দিন শুধু তারিখ নিয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত লালমনিরহাট জেলার আদালতগুলোতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মিলিয়ে মোট ৩১ হাজার ৬৪৯টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে শুধু চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতেই মামলার সংখ্যা ১১ হাজার ৫৪৭টি। এই বিপুল পরিমাণ মামলার বিপরীতে মোট ৯টি আদালত থাকলেও, ৯ জন বিচারকের মধ্যে ৬টি পদই বর্তমানে শূন্য।
আদালতের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পদে ১ জন, সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পদে ২ জন এবং জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পদে ৩ জনের বিপরীতে কোনো বিচারক নেই। এই ৬ জন বিচারকের অনুপস্থিতির কারণে গোটা বিচার ব্যবস্থায় স্থবিরতা ও দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে।
দূর-দূরান্ত থেকে আসা বিচারপ্রার্থীরা চরম ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। কালিগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়ন থেকে আসা নুর হোসেন জানান, জমি সংক্রান্ত মামলার শুনানির জন্য তাঁকে নিয়মিত আদালতে আসতে হয়। কিন্তু বিচারক না থাকায় দিনের পর দিন শুধু নতুন তারিখ নিয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে, যা তাঁর সময় ও অর্থ দুটোরই অপচয় ঘটাচ্ছে।
একইভাবে পাটগ্রামের বুড়িমারী থেকে আসা আদম আলী জানান, ৯৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে তাঁকে ভোররাতে ট্রেনে চড়তে হয়। আদালতে এসে যখন শোনেন বিচারক নেই, তখন চরম হতাশা লাগে। একটি তারিখ মিস হলে পরবর্তী শুনানির জন্য আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হয়।
অবকাঠামোগত সংকটের চিত্র তুলে ধরে লালমনিরহাট জেলা বারের আইনজীবী হাফিজুর রহমান বলেন, ২০০৭ সালে বিচার বিভাগ পৃথক হলেও লালমনিরহাটে আজও কোনো স্বতন্ত্র চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন নির্মিত হয়নি। বর্তমানে জেলা জজ আদালতের ছোট ও ঘিঞ্জি রুমে বিচার কাজ চলছে। সেখানে আইনজীবীদের বসার জায়গা নেই, আইনজীবী সহকারীদের ঢোকার পরিবেশ নেই।
এমনকি ভিন্ন ভিন্ন মামলার আসামিদের গাদাগাদি করে একই এজলাসে রেখে শুনানি করতে হয়। আসামি বেশি হলে এজলাসের বাইরে রেখেই হাজিরা নিতে হয়। এছাড়া আদালতে আসা নারী বিচারপ্রার্থীদের জন্য নিরাপদ বসার জায়গা, টয়লেট, নামাজ ঘর ও ব্রেস্ট ফিডিং কর্নারের মতো কোনো জরুরি সুযোগ-সুবিধা নেই।
জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম জানান, জেলার জনসংখ্যা ও মামলার হার বাড়লেও সেই অনুপাতে বিচারক বা অবকাঠামো বাড়েনি। বিদ্যমান ৩ জন বিচারকের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা বিচার প্রক্রিয়ার গতি ও মান দুটোই কমিয়ে দিচ্ছে। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ ও শূন্য পদে বিচারক নিয়োগ দেওয়া না হলে এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) লালমনিরহাট জেলা শাখার সভাপতি আমিরুল হায়াত মুকুল বলেন, সাধারণ মানুষের আইনি অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অবিলম্বে শূন্য পদে বিচারক নিয়োগ দেওয়া দরকার। সেই সাথে আদালতের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও পৃথক আধুনিক ভবন নির্মাণ করা জরুরি, অন্যথায় এই মামলা জট আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।
জেএইচআর