সিজিএসের আলোচনা সভায় বক্তারা

দেশে কোন নির্বাচন হচ্ছে না

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২০, ২০২৩, ০৯:৪৭ পিএম

* অর্থনীতি ও জাতিসংঘ শান্তি মিশন হুমকীতে আছে: আলী ইমাম মজুমদার
* বিরোধী দল খোঁজার এবং ছিট ভিক্ষার রাজনীতি চলছে: সাখাওয়াত হোসেন
* নির্বাচন নয় বরং বিশেষ নির্বাচনী তৎপড়তা চলছে: দেবপ্রিয় ভট্টচার্য
* যেখানে সরকারি দলের হারার সুযোগ নেই তাকে নির্বাচন বলা যায় না: নুরুল কবীর
* অর্থনৈতিক স্থিতির লক্ষ্যে রাজনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান দরকার: সালেহউদ্দিন আহমেদ

আগামী ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বিরোধী দলবিহীন একতরফা আখ্যা দিয়ে এটিকে নির্বাচন বলতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন বিশিষ্টজনেরা। তারা বলছেন, দেশে কোন নির্বাচন হচ্ছে হচ্ছে না। যা হচ্ছে, তা ‘বিরোধী দল খোঁজার’ প্রক্রিয়া। দেশে-বিদেশে কোথাও এর গ্রহণযোগ্যতা নেই।  বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘ক্রান্তিকালে বাংলাদেশ: নির্বাচন, অর্থনীতি এবং বহিঃসম্পর্ক’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)। অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে অংশ নেন সাবেক আমলা, কূটনীতিবিদ, সাবেক গভর্নর, অর্থনীতিবিদ, মানবাধিকারকর্মী, নির্বাচনবিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা।

এসময় সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ‘আমরা আবারও একটা একতরফা নির্বাচনের দিকে যাচ্ছি। একতরফা নির্বাচনের দিকে যাচ্ছি এ কারণে যে, প্রধান রাজনৈতিক দল (বিএনপি) এই নির্বাচন বর্জন করেছে। সুতরাং আগামী ভোটের ফলাফল কী হবে, ইতিমধ্যেই আসন ভাগাভাগির মাধ্যমে তা মোটামুটি নির্ধারিত হয়ে আছে। এই নির্বাচনের ফলাফলটা আমাদের জন্য তেমন আকর্ষণীয় বিষয় নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো এখানে (দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন) অংশগ্রহণ করছে, তাদের দাবি ছিল নৌকা প্রতীক দেওয়া এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সরিয়ে দেওয়া। এটাকে ভিক্ষা করার রাজনীতি বলা হচ্ছে। এটা কি নতুন চালু হলো? আগেও দুবার এমন হয়েছে। এটা জাতির জন্য দুঃখজনক।’ দেশে রাজনৈতিক শূন্যতায় ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর উত্থান হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ‘আমাদের রাজনীতির মাঠে মূল খেলোয়াড়দের একটি বর্তমান ক্ষমতাসীন দল, অন্যটি বিএনপি, যারা নির্বাচনের বাইরে আছে। তাদের নিঃশেষ করার জন্য সব ধরনের রাজনৈতিক প্রচেষ্টা চালমান আছে। এর ফলে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। এই জায়গাটা ধর্মান্ধরা দখল করে নিতে পারে। এটা আমাদের দেশের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে।’

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বিরোধী দল খোঁজার এবং সিট (আসন) ভিক্ষা করার রাজনীতি চলছে। ২৬ দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, তাদের ১৩টি দলের নামও কেউ বলতে পারবে না। আসন ভাগাভাগির পর সরকারি দলের ২৪০ আসন নিশ্চিত।’ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ‘নতুন সংজ্ঞা’ তৈরি করা হচ্ছে বলে মনে করেন সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ বলতে চাচ্ছেন, জনগণ অংশগ্রহণ করলেই অংশগ্রহণমূলক। তাহলে স্বৈরশাসকদের সময়ের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কেন? অংশগ্রহণমূলক মানে যারা চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবে, প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন করতে পারবে, সেসব দলের অংশগ্রহণ।’ সাখাওয়াত হোসেন আরও বলেন, ‘যে দলই এসেছে, তারা ব্যবস্থাকে দুর্নীতিগ্রস্ত করেছে। ৫ শতাংশ ভোট পড়ছে, তা অন্তত ১৫ শতাংশ দেখানো হচ্ছে। ভোট পড়ার যে হার, তা বিশ্বাসযোগ্য কি না।’ সবকিছু ঠিক থাকলেও আগামী নির্বাচনে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ ভোটার উপস্থিতি হবেন কি না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি। এই নির্বাচনের পর দেশের রাজনীতি হারিয়ে যাবে বলে মনে করেন সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার। তিনি বলেন, ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনীতি আর দেশে থাকবে না। উদার গণতন্ত্রের কথা ভুলে যেতে হবে, বিশেষায়িত গণতন্ত্রে প্রবেশ করব।
আগামী নির্বাচনে সরকারি দলের হারার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা নিউএজের সম্পাদক নূরুল কবির। তিনি বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পদক্ষেপ সুষ্ঠু নির্বাচন। গত ৫২ বছরে এ পদক্ষেপই নেওয়া যায়নি। অসাধু ব্যবসায়ী, অসাধু রাজনীতিবিদ ও আমলারা মিলে একটি চক্র তৈরি করেছেন। এই চক্র ভাঙা ছাড়া পথ নেই। সরকার মানুষের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে একদলীয় নির্বাচন করতে যাচ্ছে বলে মনে করেন নূরুল কবির। তিনি বলেন, ‘ভারত, রাশিয়া ও চীন সমর্থন দিচ্ছে। তাদের কাছ থেকে আমরা অর্জিত আয় দিয়ে পণ্য ক্রয় করি। ইউরোপ, আমেরিকায় পণ্য রপ্তানি করে আয় করি। এক জায়গায় আমরা খরচ করি, আরেক অঞ্চল থেকে আয় করি। স্বার্থ কোন দিকে বেশি, সেই অর্থনৈতিক অঙ্কও হিসাব করতে হবে।’

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচনকে আমি নির্বাচন বলতে চাই না। আমি বলি, এটা বিশেষ নির্বাচনী তৎপরতা। গত দুটি বড় নির্বাচনেও সাংবিধানিক বৈধতা রক্ষা করা হয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক বৈধতা রাখতে পারি নাই।’ এর ফলে রাষ্ট্রযন্ত্র বৈধতার প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। এমনটা হলে সংকট তৈরি হয়, জবাবদিহীতা থাকে না।  রাষ্ট্রের দক্ষতা কমে যায়, উত্তরণের সক্ষমতা কমে যায়, রাষ্ট্রশক্তির একচেটিয়া প্রয়োগ হয়। বর্তমানে এর সবই হচ্ছে।

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘যখনই আপনার ভোটের জন্য মানুষের কাছে যেতে হয় না, তখনই আর জবাবদিহি থাকে না। আমাদের মতো দেশে হস্তক্ষেপ পশ্চিমারাও করে, অপশ্চিমরাও করে। যখন যে যেখানে সুযোগ পায়, তখন সে সেখানে করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে যে ভাষ্য আসছে, তাতে পশ্চিমের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক করার কোনো লক্ষণ বা প্রমাণ দেখা যাচ্ছে না। তাদের বাদ দিয়ে কি আমরা চলতে পারব? যদি কোনো নিষেধাজ্ঞা আসে, তাহলে তো আমাদের ক্রয়ক্ষমতা থাকবে না। কোনোভাবেই দুর্ভিক্ষ ঠেকানো যাবে না। পোশাক খাতে কর্মরত ৩০ লাখ নারী রাস্তায় নেমে আসবে, কারণ তাদের ক্রয় ক্ষমতা থাকবে না।’ কূটনীতিতে মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হয় স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, মাঝে মধ্যে পরিস্থিতি এমন হয় যখন একটি পক্ষ বেছে নিতে হয়। বর্তমানে যদি এক পক্ষ বেছে নেয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়ে থাকে তাহলে আমেরিকার বিপক্ষে যাওয়ার সুযোগ নেই।

সরকার দেশের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে মন্তব্য করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকার বারবার বহিরাগত সমস্যাকে সামনে এনেছে। ভেতরের সমস্যা দিন দিন গুরুতর হয়েছে। ব্যাংকিং, দুর্নীতি, অপচয়, প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় এই বিষয়গুলোকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, মার্চে ঠিক হয়ে যাবে, এপ্রিলে রপ্তানি বাড়বে এসব কথা বলে লোকজনকে বোকা বানানোর চেষ্টা হয়। এসব সমস্যা অনুধাবন না করতে পারলে সমাধান হবে না। সরকারের ভ্রান্ত নীতি এবং নীতির বাস্তবায়ন না হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো দিন দিন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি নেই। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার দেশ। একটু নাড়াচাড়া লাগলেই রপ্তানি হবে না। পোশাক খাতের কিছু হলে দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে। তার মানে বিকল্প রপ্তানি খোঁজা হয়নি।

সরকার প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে, তা ভুল বলে মনে করেন সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, কীভাবে প্রবৃদ্ধি হঠাৎ ৭ শতাংশ হয়ে যায়? প্রবৃদ্ধিই সব নয়। আয় ও সম্পদের বৈষম্য তো বাড়ছে। সরকারি তথ্য-উপাত্ত খুবই বিভ্রান্তিকর। রপ্তানি নিয়ে সরকারের একেক সংস্থা একেক তথ্য দিচ্ছে। ঋণের টাকায় সরকারি প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বৃদ্ধির সমালোচনা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সাবেক গভর্নর। তিনি বলেন, ‘৫ বছরের প্রকল্প ১০ বছর হয়ে যায়। ৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প ৩০ হাজার কোটি টাকা হয়ে যায়। বিদেশ থেকে আনা ঋণের টাকা অপচয় করছি। ১০ টাকার জিনিস ৫০ টাকা ব্যয় করলে কীভাবে ফেরত দেব? মানুষ কী চায়? টানেল চায় নাকি কালভার্ট চায়? বিশাল হাসপাতাল করলেন, ডাক্তার নাই।’ সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, অনেকে বলেন, আমেরিকাতেও দুর্নীতি হয়। সেখানে জেল থেকে বের হলে কিছুই থাকে না। আর এখানে ঋণখেলাপি, চুরি করা লোকজন মহা আনন্দে বাড়ি কিনছেন, গাড়ি কিনছেন। বাইরে দুর্নীতি হলে সেটার বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এখানে তো জবাবদিহি নেই, আইনের শাসন নেই। রাজনীতি ঠিক না হলে জবাবদিহি, নীতি ঠিক হবে না। এই বিষয়গুলো না দেখলে সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হবে।

সরকার উন্নয়নের যে বয়ান দিচ্ছে, তার সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার মান, ভোগান্তির চিত্র মিলছে না বলে মনে করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, রাজস্ব, আমদানি, রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সূচক নিম্নমুখী। সরকার জিডিপির যে সংখ্যা দিচ্ছে, তাতে মনে হয়, শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি করছে। সরকার জিডিপির যে দাবি করে তা ধোপে টেকে না বলে মন্তব্য করেন আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, জিডিপি তুখোড় বেগে এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বাকি সূচক নিচে নামছে। উন্নয়নের বয়ান দিয়ে চলা যায়, কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন করা যায় না। সরকার মূল্যস্ফীতিকে চাপিয়ে রাখছে। ১০ শতাংশ পার করতে দেয় না। নির্বাচনের পর সরকারের সামনে আরও চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে বলে মনে করেন আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, যে নকশাতেই নির্বাচন হোক, অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব না দিলে তা আত্মঘাতী হয়ে যেতে পারে। 
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিজিএসের চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী। সঞ্চালনা করেন সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান।

আরএস