শুল্ক বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ছে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা প্রকাশিত: নভেম্বর ১৮, ২০২৫, ১২:৪৯ পিএম

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত এ বছর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবেশে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা বাড়তি শুল্ক এ খাতের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

তারপরও চলতি ২০২৪–২৫ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই–অক্টোবর) মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৫ দশমিক ১৪ শতাংশ যা বিশেষজ্ঞদেরও কিছুটা বিস্মিত করেছে।

গত আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার প্রতিটি বাংলাদেশি পোশাক-পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ বেশি শুল্ক দিতে হচ্ছে। সাধারণত এ ধরনের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ হলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর রপ্তানি কমে যায়। 

কিন্তু এবার যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি দেখা গেছে উল্টো চিত্র এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে গেছে ২৫৯ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা এখনও শক্তিশালী। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে মধ্য মানের পোশাকে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। খরচ সাশ্রয়ী উৎপাদন, স্থিতিশীল গুণমান এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে পারায় বাংলাদেশ এখনও প্রতিযোগিতায় টিকে আছে।

রপ্তানি বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বড় খুচরা বিক্রেতারা বছরের শেষের ক্রিসমাস বিক্রির জন্য জুলাই–অক্টোবরে বিপুল পরিমাণ পণ্য অর্ডার করে। সেই চাহিদার সুফল পেয়েছে বাংলাদেশ। অনেক ক্রেতা বিকল্প বাজারে (যেমন ভিয়েতনাম, মেক্সিকো বা কম্বোডিয়া) সরতে চাইলেও এখনো বাংলাদেশ তার মূল্য দক্ষতার কারণে মূল সরবরাহকারী হিসেবে টিকে আছে।

বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় গন্তব্য দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে ইইউভুক্ত বাজারে গেছে ৬২৫ কোটি ৭২ লাখ ডলার মূল্যের তৈরি পোশাক যা বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৪৮ শতাংশ। তবে প্রবৃদ্ধির হার খুবই কম, মাত্র শূন্য দশমিক ৪৬ শতাংশ।

এই প্রবৃদ্ধি কম হওয়ার মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন, ইউরোপে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে, ইইউর বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো অতিরিক্ত মজুদ কমাচ্ছে এবং ‘স্থায়ী ফ্যাশন’ বা টেকসই পোশাকের দিকে ঝোঁক বাড়ছে, যেখানে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক এখনও ইউরোপে জনপ্রিয় হলেও অর্ডারের পরিমাণ খুব বেশি বাড়ছে না।

যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম গন্তব্য। জুলাই–অক্টোবরে সেখানে রপ্তানি হয়েছে ১৫৩ কোটি ৩৯ লাখ ডলার মূল্যের পোশাক; প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক ৭২ শতাংশ। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রেক্সিট পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্য বাজারে কিছুটা গতি ফিরেছে, যা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক।

দেশটির পোশাক আমদানিকারকরা তুলনামূলক কম খরচের সরবরাহকারী হিসেবে বাংলাদেশকে পছন্দ করে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যেও সেখানকার খুচরা দোকানগুলো মধ্য মানের পোশাকে বাংলাদেশকে নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে দেখছে।

এই সময়ে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক চিত্র দিয়েছে কানাডা। দেশটিতে রপ্তানি বেড়েছে ১০ দশমিক ৮৪ শতাংশ, যার পরিমাণ ৪৪ কোটি ২৩ লাখ ডলার। কানাডায় পোশাকের আমদানি–চাহিদা তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকার পাশাপাশি সেখানকার বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে আমদানি বাড়িয়েছে।

যেখানে প্রচলিত বাজারগুলোর চিত্র মোটামুটি ইতিবাচক, সেখানে অপ্রচলিত ১৫টি বাজারে রপ্তানি কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। জুলাই–অক্টোবরে এ বাজারগুলো থেকে এসেছে ২১৬ কোটি ৯৯ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৬৯ শতাংশ কম।

অপ্রচলিত বাজার বলতে মূলত জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, রাশিয়া, ব্রাজিল, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশকে বোঝায়। 

এ বাজারগুলোতে রপ্তানি কমার কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, জিও রাজনৈতিক অস্থিরতা, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার অস্থিরতা।

কিছু দেশে আবার আমদানি শুল্ক বা বিধিনিষেধ বেড়েছে, যা বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা কমিয়েছে।

রপ্তানি আয়ের সামগ্রিক চিত্র বলছে, প্রচলিত বাজারগুলো মোট রপ্তানিকে টেনে রাখলেও নতুন বাজারে সম্প্রসারণের উদ্যোগ সেভাবে ফল দিচ্ছে না। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক বাধা স্থায়ী হলে আগামী মাসগুলোতে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

তবে উদ্যোক্তারা আশাবাদী। তাদের মতে, ব্র্যান্ডগুলো সরবরাহ ঝুঁকি এড়াতে বাংলাদেশকে প্রাধান্য দিচ্ছে, উৎপাদন সক্ষমতা ও গুণমান আগের তুলনায় অনেক উন্নত এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের দিকে দ্রুত ঝুঁকছে ফ্যাক্টরিগুলো।

তবে অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি বাড়াতে সরকারকে বাজার বহুমুখীকরণ, বাণিজ্য চুক্তি, পরিবহন খরচ কমানো ও ব্র্যান্ড সংযোগ বাড়ানোর ওপর আরও গুরুত্ব দিতে হবে বলে তারা মনে করেন।

ইএইচ