দেশের ভোজ্যতেল বাজারে হঠাৎ করে নতুন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো পূর্বঘোষণা বা সরকারি অনুমোদন ছাড়াই সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৯ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিষয়টি সরাসরি জানতে পেরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। তাঁর ভাষায়, এভাবে দাম বাড়ানোর আইনগত ভিত্তি নেই। সরকারকে না জানিয়ে ব্যবসায়ীরা এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
বুধবার দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, মাত্র আধা ঘণ্টা আগে তিনি বিষয়টি জানতে পেরেছেন। সরকার এখন এই অঘোষিত মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
বাণিজ্য উপদেষ্টা জানান, মাত্র গতকালই সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ টিসিবির জন্য দেড় কোটি লিটার ভোজ্যতেল কেনার অনুমোদন দিয়েছে যার মধ্যে রয়েছে ৫০ লাখ লিটার সয়াবিন তেল এবং এক কোটি লিটার রাইস ব্রান তেল। অথচ সরকার যে দামে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তেল কিনেছে, আজ বাজারে সেই একই তেল লিটারে প্রায় ২০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
তিনি সরাসরি প্রশ্ন করেন, যেখানে সরকারের বিল করা মূল্য কম, সেখানে বাজারে আজ এত বেশি দাম হওয়ার কারণ কী? এর যৌক্তিকতা কোথায়?
ব্যবসায়ীরা কীভাবে সরকারের অনুমতি ছাড়াই দাম বাড়াল এই প্রশ্নে উপদেষ্টা বলেন,
এটা ব্যবসায়ীদের জিজ্ঞেস করুন। আমরা আলোচনা করছি, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও নিচ্ছি। বাজারে গিয়ে যুদ্ধ করার বিষয় নয়, তবে নিয়ম ভাঙলে অবশ্যই ব্যবস্থা হবে।
তিনি আরও বলেন, যদি তেলের মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিক কারণ থাকে, তবে তা পরিষ্কারভাবে আলোচনা করা উচিত। সরকার সরবরাহ ব্যবস্থাকে গতিশীল রাখতে আগ্রহী, কিন্তু কেউ যদি বাজারকে ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তাহলে তা মেনে নেওয়া হবে না।
ভোজ্যতেল আমদানিকারক ও পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানের দাবি, মন্ত্রণালয় বা ট্যারিফ কমিশনের অনুমতি ছাড়াই তারা দাম বাড়াতে পারেন। বাণিজ্য উপদেষ্টা তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন, এটা তাঁদের বক্তব্য, কিন্তু আমরা তাঁদের এই দাবি মানি না। প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালায় পরিষ্কারভাবে বলা আছে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম নির্ধারণে সরকারের ভূমিকা রয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সরকারের লক্ষ্য বাজারের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং ভোক্তা স্বার্থ রক্ষা ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা।
কয়েক মাস পরই শুরু হবে রমজান। এ সময় ভোজ্যতেলের ব্যাপক চাহিদা থাকে। এই প্রেক্ষাপটে প্রস্তুতি বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা ইতিমধ্যে আমদানির পর্যায়ে প্রয়োজনীয় এলসি খুলে যাওয়ার তথ্য পেয়েছি। গত রমজানের তুলনায় এ বছর আরও বেশি এলসি খোলা হচ্ছে। তাই সরবরাহ সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই।
তিনি আরও জানান, বাজারের কিছু পণ্যের দাম ইতিমধ্যেই কমতে শুরু করেছে চিনি, ডাল, ডিমের দাম কমেছে; ছোলার দামও কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
এরই মধ্যে বিকেলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভায় অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইনের খসড়া নিয়ে আলোচনা হয়। উপস্থিত ছিলেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান। বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নির্ধারিত পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণের একটি সুস্পষ্ট সূত্র রয়েছে। পরিশোধন কারখানার সমিতি যদি মন্ত্রণালয়ের সাথে পরামর্শ না করে হঠাৎ দাম বাড়ায় এটা আইন লঙ্ঘন ছাড়া আর কিছুই নয়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইনে প্রয়োজনে পরিশোধন কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার বিধানও রয়েছে।
মজুতদারি বা বাজার কারসাজি করলে প্রতিযোগিতা আইন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনসহ বিশেষ আইন প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে। আমরা চাই, সরকার এসব আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করুক।
সফিকুজ্জামান বলেন, ইদানীং বাজার তদারকি তেমন দেখা যাচ্ছে না। রাজনীতি ও নিরাপত্তার পাশাপাশি দ্রব্যমূল্যও দেশের মানুষের জীবনের বড় প্রশ্ন। তাই বাজার নজরদারি জোরদার হওয়া জরুরি।
তিনি মনে করেন, ভোজ্যতেলের দাম এমনভাবে বাড়ানো হলে শুধু ভোক্তা নয়, পুরো বাজারই নেতিবাচক প্রভাবের মধ্যে পড়ে। বিশেষত রমজান সামনে রেখে বাজারের এমন পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
সরকারের অনুমতি ছাড়াই ব্যবসায়ীরা যখন অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন, তখন সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ ভোক্তারা। বাণিজ্য উপদেষ্টার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট সরকার হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধিকে সহজভাবে দেখছে না। টিসিবির বড় আকারের ক্রয় অনুমোদন, আমদানির এলসি বৃদ্ধি এবং আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখার ঘোষণার মধ্যেই রয়েছে সরকারের প্রস্তুতির ইঙ্গিত।
এখন দেখার বিষয় চাপের মুখে ব্যবসায়ীরা মূল্য সমন্বয় করেন কি না, কিংবা সরকার কঠোর আইন প্রয়োগে এগিয়ে যায় কি না। ভোক্তারা অপেক্ষায় কথা নয়, বাস্তব পদক্ষেপ দেখতে চান।
জেএইচআর