গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর

ব্যাংক খাতের সংকটে ‘পূর্ণ স্বাধীনতা’ চায় বাংলাদেশ ব্যাংক

আবু তাহের, মাল্টিমিডিয়া প্রতিবেদক প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১৮, ২০২৫, ০৯:০৪ পিএম

দেশের ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্তের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন’ নিয়ে আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। একদিকে গভর্নর নীতিনির্ধারণী সীমাবদ্ধতার কথা বলছেন, অন্যদিকে অর্থনীতিবিদেরা কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছেন।

বৃহস্পতিবার রাজধানীতে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘ব্যাংকিং খাত সংস্কার: চ্যালেঞ্জ উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

গভর্নর বলেন, “আমরা একটি খারাপ অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে উন্নতির পথে যাচ্ছি। ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরেছে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা এসেছে। বর্তমানে ব্যালান্স অব পেমেন্ট বা ডলার পরিস্থিতি নিয়ে কোনো উদ্বেগ নেই।”

তবে ব্যাংকিং খাতের সংকট স্বীকার করে তিনি জানান, খেলাপি ঋণের হার প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি। গভর্নর বলেন, “আমার ধারণা ছিল খেলাপি ঋণ ২৫ থেকে ২৭ শতাংশ হবে, কিন্তু বাস্তবে তা প্রায় ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আমরা কোনো তথ্য লুকাবো না, সত্যটাই প্রকাশ করা হবে।”

ব্যাংক সংস্কারের অংশ হিসেবে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান গভর্নর। আমানতকারীদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, একীভূত ব্যাংকগুলোর আমানত সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে এবং আমানত বিমা ব্যবস্থার আওতায় দুই লাখ টাকা পর্যন্ত সুরক্ষা দেওয়া হবে। এছাড়া ২০ কোটি টাকার বেশি সব ঋণ নতুন করে যাচাই করা হবে এবং অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।

সেমিনারে অর্থনীতিবিদরা জানান, রাজনৈতিক চক্র ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব রুখতে শক্তিশালী ও স্বায়ত্তশাসিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিকল্প নেই। সাবেক আইএমএফ অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতার জন্য একটি আইন প্রস্তাব করা হয়েছে। এই সরকার আইনটি পাস করলে প্রয়োজনীয় সব সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।”

একই অনুষ্ঠানে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় জাতীয় বাজেটের সমান। তিনি বলেন, “আগে প্রকৃত চিত্র আড়াল করায় খেলাপি ঋণের হার কম দেখানো হতো। এখন আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী হিসাব করায় এই হার অস্বাভাবিক বেড়েছে।”

আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে ব্যাংকিং খাত নিয়ে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার থাকা জরুরি বলে মন্তব্য করেন ফাহমিদা খাতুন। 

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংককে কেবল নীতিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি স্বাধীনতা দিতে হবে, যাতে রাজনৈতিক চাপ ছাড়াই শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।

ইএইচ