বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে দেশের সম্পূর্ণ ব্যাংকিং খাতকে সরাসরি প্রচারণায় সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে যে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে, সেখানে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে জনসচেতনতা তৈরি ও প্রচারণার গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। এই প্রচার কার্যক্রমের যাবতীয় ব্যয় মেটানো হবে ব্যাংকগুলোর করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিল থেকে।
গত রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় এই বিশেষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সভায় দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় গভর্নর নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে আর্থিক খাতের ভূমিকা এবং সরকারের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন।
উপস্থিত একাধিক ব্যাংকের এমডি জানিয়েছেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের গুরুত্ব সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ব্যাংকগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
জানা গেছে, গত ৫ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবিকে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। ৪ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে তাঁর বিশেষ সহকারীর এক বৈঠকের পর এই সম্মতির কথা জানানো হয়।
চিঠিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ভোটারদের সচেতন করতে প্রতিটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শাখায় অন্তত দুটি করে বড় ব্যানার দৃষ্টিনন্দন স্থানে স্থাপন করতে হবে। এই ব্যানারগুলোর খরচ বহন করবেন স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা।
প্রচারণার ক্ষেত্রে ব্যয়ের খাত হিসেবে ব্যাংকের সিএসআর তহবিলকে ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে সংহতি প্রকাশ করে বলেন, প্রধান উপদেষ্টার অফিস থেকে নির্দেশনা এসেছে প্রতিটি শাখায় হ্যাঁ ভোট উৎসাহিত করতে ব্যানার টাঙানোর। এছাড়া যেসব এনজিও এই জনসচেতনতা নিয়ে কাজ করবে, তাদের সিএসআর তহবিল থেকে অর্থায়ন করতে বলা হয়েছে।
এবিবির পক্ষ থেকেও তহবিল দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। মাসরুর আরেফিন আরও যোগ করেন, এই সরকার সাধারণ সরকার নয়, এটি সংস্কারমুখী সরকার, তাই দেশ ও সংস্কারের স্বার্থে এমন উদ্যোগ যৌক্তিক।
এদিকে নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অবৈধ অর্থ বা কালো টাকার প্রভাব যেন না পড়ে, সে লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বা বিএফআইইউ। আগে ১০ লাখ টাকার বেশি লেনদেনের তথ্য মাসিক ভিত্তিতে পাঠাতে হলেও এখন তা সাপ্তাহিক ভিত্তিতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আর্থিক খাতের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন কারসাজি রোধে গোয়েন্দা নজরদারি এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ এ মূলত সংবিধানের মৌলিক সংস্কার, রাষ্ট্র পরিচালনা পদ্ধতি এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রস্তাবসমূহ লিপিবদ্ধ রয়েছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ভোটাররা ব্যালট পেপারে এই সনদের পক্ষে বা বিপক্ষে রায় দেবেন। ব্যাংকগুলোর প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণকে বোঝানো যে, একটি আধুনিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনে এই সনদের ওপর হ্যাঁ ভোট দেওয়া জরুরি।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা এই উদ্যোগকে ভিন্নভাবে দেখছেন। অনেকের মতে, ব্যাংকগুলো সাধারণত নিরপেক্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে, সেখানে কোনো বিশেষ প্রস্তাবের পক্ষে প্রচারণায় নামা একটি নতুন প্রথা তৈরি করবে।
তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেক্ষাপট এবং রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষাকে বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংক খাত এই বিশেষ জাতীয় দায়িত্বে শরিক হচ্ছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শাখায় ব্যানার টাঙানো, সিএসআর তহবিল থেকে অর্থায়ন এবং বিএফআইইউ এর কঠোর নজরদারির মধ্য দিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের দিনেই এই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
জেএইচআর