বাংলাদেশের অর্থনীতির ক্রান্তিলগ্নে ব্যবসায়িক নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণী সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে এক বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তাঁর মতে, দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীন সত্তা হারিয়ে ‘পুতুল’ বা পাপেটের মতো আচরণ করছে। যখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কিংবা যখন দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছিল, তখন এই সংগঠনগুলোর নীরবতা বা তোষামোদমূলক অবস্থান দেশের গণতন্ত্র ও অর্থনীতি উভয়কেই দুর্বল করেছে।
গভর্নর আহসান এইচ মনসুর অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি কয়েকটি সুনির্দিষ্ট উদাহরণ দিয়ে তাদের ব্যর্থতা তুলে ধরেন:
৬-৯ সুদহারের তুঘলকি কাণ্ড: যখন বাজারে ঋণের সুদের হার জোরপূর্বক ৬ থেকে ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছিল, যা অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মের পরিপন্থী ছিল, তখন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এর প্রতিবাদ করার বদলে হাততালি দিয়ে স্বাগত জানিয়েছিল।
অর্থ পাচারে নীরবতা: গত দেড় দশকে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে গেছে। গভর্নর অভিযোগ করেন, যখন সম্পদ লুণ্ঠন হচ্ছিল, তখন ব্যবসায়ী নেতারা নিশ্চুপ থেকে প্রকারান্তরে একে প্রশ্রয় দিয়েছেন।
গণতন্ত্রের ওপর প্রভাব: গভর্নরের মতে, ব্যবসায়িক নেতৃত্ব যদি মেরুদণ্ড সোজা করে সত্য বলতে না পারে, তবে সুস্থ ধারার গণতন্ত্র কখনো বিকশিত হতে পারে না।
ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশ (আইসিসিবি) আয়োজিত এই গোলটেবিলের মূল আলোচনার বিষয় ছিল স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ। এখানে ব্যবসায়ী নেতা এবং গভর্নরের মধ্যে স্পষ্ট মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতাদের অবস্থান: এ কে আজাদসহ শীর্ষ ব্যবসায়ীরা এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার পক্ষে জোরালো যুক্তি দিয়েছেন। তাঁদের মতে, বর্তমান মুদ্রানীতি ও উচ্চ সুদহারের কারণে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে। গত ছয় মাসে ১২ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে এবং আগামী ছয় মাসে আরও ১২ লাখ মানুষ বেকার হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। এই অবস্থায় এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটলে রপ্তানি ও শুল্ক সুবিধা কমে যাবে, যা শিল্প খাতকে আরও সংকটে ফেলবে।
গভর্নরের অনড় অবস্থান: আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ একটি সম্মানের বিষয়। বাংলাদেশকে সোমালিয়া বা দক্ষিণ সুদানের মতো দারিদ্র্যপীড়িত দেশগুলোর তালিকায় রাখা অপমানজনক। উন্নয়নশীল দেশের কাতারে গিয়ে মালয়েশিয়া বা ভারতের মতো বৈশ্বিক সম্মান অর্জনই বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত। ছোটখাটো সুবিধার লোভে বড় সুযোগ হাতছাড়া করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
সুদহার বৃদ্ধি নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের জবাবে গভর্নর স্বীকার করেছেন যে, বর্তমানে বাংলাদেশে সুদহার বেশি। তবে এর পেছনে থাকা ঐতিহাসিক কারণগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আমানতের সংকট: এক সময় আমানতের প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশে নেমে গিয়েছিল, যা এখন বেড়ে ১১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আমানত বাড়াতে হলে সুদহার সাময়িকভাবে বাড়াতেই হয়।
খেলার ঋণ ও সুশাসন: খেলাপি ঋণ কমানো এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি জোরদার না হলে সুদহার স্থায়ীভাবে কমানো সম্ভব নয়। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফিরলে এবং মূল্যস্ফীতি কমলে তবেই সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে আসবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে একটি আধুনিক আইন সংস্কারের প্রস্তাব চার মাস আগে সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেটি এখনো অনুমোদিত হয়নি।
গোলটেবিলে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ী নেতারা দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন। মুদ্রানীতিকে অত্যন্ত সংকোচনশীল দাবি করে তাঁরা বলছেন:
* রাজস্ব আদায় আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
* দেশে নতুন বিনিয়োগ প্রায় শূন্যের কোঠায়।
* ক্রমাগত ছাঁটাইয়ের ফলে বেকারত্ব বাড়ছে।
তাঁদের দাবি, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এলডিসি উত্তরণ নিয়ে পুনর্বিবেচনা করা উচিত, কারণ বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে নতুন শুল্ক কাঠামো মেনে নেওয়া শিল্পের জন্য আত্মঘাতী হবে।
আলোচনার সারসংক্ষেপ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি দ্বিমুখী সংকটে। একদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর স্বপ্ন (এলডিসি উত্তরণ), অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারে অস্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগ সংকট।
গভর্নরের এই বক্তব্য থেকে তিনটি প্রধান দাবি উঠে আসে:
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সংস্কার: এফবিসিসিআই বা বিজিএমইএ-র মতো সংগঠনগুলোকে কোনো বিশেষ দলের বা গোষ্ঠীর লেজুড়বৃত্তি না করে দেশের স্বার্থে পেশাদার হতে হবে।
ব্যাংকিং আইনের আধুনিকায়ন: কেন্দ্রীয় ব্যাংককে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে।
খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি বন্ধ: যারা ব্যাংক লুণ্ঠন করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে সৎ ব্যবসায়ীরা উচ্চ সুদের বোঝা থেকে মুক্তি পাবেন না।
বনানীর এই গোলটেবিল বৈঠক বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি স্বচ্ছ আয়না হিসেবে কাজ করেছে। একদিকে গভর্নরের ‘কঠোর সত্য’ ভাষণ, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের ‘অস্তিত্ব রক্ষার’ আকুতি। তবে সমাধান কেবল একে অপরকে দোষারোপে নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে যেমন মুদ্রানীতিতে ভারসাম্য আনতে হবে, তেমনি ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে ‘পুতুল’ না হয়ে সত্যিকার অর্থে অর্থনীতির অংশীজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্মান আর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার লড়াইয়ে এই দুই পক্ষের সমন্বয়ই এখন সময়ের দাবি।
এএন