প্রযুক্তিবাজারে নেমে এসেছে অস্বস্তির ছায়া। জানুয়ারির প্রথম দিন থেকেই ব্র্যান্ডভেদে স্মার্টফোনের দাম ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ঠিক একই সময়ে সরকার অবৈধ হ্যান্ডসেট বন্ধে 'ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার' (এনইআইআর) কার্যকর করেছে এবং পাশাপাশি কমিয়েছে আমদানি শুল্ক। আপাতদৃষ্টিতে শুল্ক কমলে দাম কমার কথা থাকলেও বাজারের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যবসায়ীরা আগে দাম বাড়িয়ে এখন শুল্ক ছাড়ের দোহাই দিয়ে যেটুকু কমানোর কথা বলছেন, তা আসলে শুভঙ্করের ফাঁকি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্প্রতি মুঠোফোনের আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে নামিয়ে ১০ শতাংশে এনেছে। অর্থাৎ আমদানিকৃত ফোনের ক্ষেত্রে শুল্ক কমেছে ১৫ শতাংশ। এছাড়া দেশে যারা মোবাইল সংযোজন করেন, তাদের কাঁচামাল আমদানিতেও শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।
৩০ হাজার টাকার বেশি দামের ফোনে দাম কমার কথা প্রায় ৫,৫০০ টাকা। ৩০ হাজার টাকার কম দামের ফোনে দাম কমার কথা প্রায় ১,৫০০ টাকা।
কিন্তু বাস্তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, দাম এত বেশি কমার সম্ভাবনা নেই। বিশেষ করে দেশি সংযোজিত ফোনের ক্ষেত্রে শুল্ক বিন্যাসের জটিলতার কারণে দামের প্রভাব পড়বে মাত্র ০.৭৫ থেকে ০.৮৬ শতাংশ। ফলে যে ছাড়ের কথা কাগজে-কলমে বলা হচ্ছে, বাজারে তার প্রতিফলন হবে সামান্যই।
শুল্ক কমার দিনেও কেন দাম বাড়ল—এমন প্রশ্নে ব্যবসায়ীরা আঙুল তুলছেন বৈশ্বিক বাজারের দিকে। তাদের মতে, বর্তমানে ইলেকট্রনিক পণ্যে ব্যবহৃত এআই (AI) চিপসেট এবং মেমোরির দাম আকাশচুম্বী।
শাওমি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার জিয়াউদ্দিন চৌধুরী জানান, যে মেমোরি আগে ১০ ডলারে পাওয়া যেত, তা এখন ৬০ ডলারে কিনতে হচ্ছে। ভারত, নেপাল বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোতেও গত বছরের শেষ দিকে একই কারণে দাম বেড়েছে। ফলে বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতির চাপ এসে পড়েছে বাংলাদেশের ক্রেতাদের ওপর।
দীর্ঘদিন ধরে দেশে 'অফিশিয়াল' ও 'আনঅফিশিয়াল' ফোনের একটি অদৃশ্য যুদ্ধ চলছিল। কম দামের কারণে সাধারণ মানুষ কর ফাঁকি দিয়ে আনা আনঅফিশিয়াল ফোনের দিকেই ঝুঁকত বেশি। গত ১ জানুয়ারি থেকে এনইআইআর চালুর মাধ্যমে এই বাজার বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল, আনঅফিশিয়াল বাজার বন্ধ হলে তারা শুল্ক হ্রাসের সুবিধা ক্রেতাদের দেবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিযোগিতা কমতে থাকায় এখন বৈধ আমদানিকারকরাই একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছেন।
চলতি মাসের বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, জনপ্রিয় সব ব্র্যান্ডের ফোনের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। শাওমি রেডমি এ৫ (৪/৬৪ জিবি) মডেলের ফোনটির ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে দাম ২ হাজার টাকা বেড়েছে। একইভাবে রেডমি নোট ১৪ প্রো (৮/২৫৬ জিবি) মডেলের দাম বেড়েছে ৫ হাজার টাকা। ভিভো ওয়াই২১ডি (৮/১২৮ জিবি) মডেলেও ২ হাজার টাকা মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। এছাড়া স্যামসাংয়ের বিভিন্ন মডেলের ফোনের দাম ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারিতে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
ব্যবসায়ীরা এখন বলছেন, ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে তারা দাম কিছুটা কমাবেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের মতে, যে ফোন ৫ হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে, সেখানে ১ হাজার টাকা কমানোকে কোনোভাবেই 'দাম কমানো' বলা যায় না। এটি মূলত বর্ধিত মূল্যের ওপর এক ধরনের আইওয়াশ।
মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ এই পরিস্থিতিকে বড় ধরনের প্রতারণা হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, যখনই সরকার শুল্ক কমায়, সেই সুবিধা ব্যবসায়ীদের পকেটে চলে যায়। এতে রাষ্ট্র রাজস্ব হারায় আর জনগণ উচ্চমূল্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়।
অন্যদিকে, বিডিজবসের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর মনে করেন, শুল্ক আরও কমানো প্রয়োজন। তিনি বলেন, গ্রে মার্কেট উঠে যাওয়ায় বাজারে এখন প্রতিযোগিতা কমে গেছে। এই সুযোগে বৈধ আমদানিকারকেরা নিজেদের মতো করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। শুল্ক অন্তত ৫ শতাংশে না নামালে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।
ফেব্রুয়ারি মাসের নতুন মূল্যতালিকার দিকে তাকিয়ে আছেন প্রযুক্তিপ্রেমীরা। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, শুল্ক ছাড়ের সুফল সরাসরি সাধারণ মানুষের পকেটে পৌঁছানোর সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। একদিকে যান্ত্রিক আধুনিকতার প্রয়োজন, অন্যদিকে উচ্চমূল্যের চাপ এই দুইয়ের মাঝে পিষ্ট হচ্ছে মধ্যবিত্ত ক্রেতা। সরকারের কঠোর নজরদারি না থাকলে 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' গড়ার অন্যতম অনুষঙ্গ এই স্মার্টফোন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরেই থেকে যেতে পারে।
এএন