দেশের স্বর্ণের বাজারে এক অবিশ্বাস্য ও নজিরবিহীন চিত্র দেখা গেল আজ। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) দুই দফা স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি করেছে।
শনিবার সকালে একবার দাম বাড়ানোর পর বিকেলেই দ্বিতীয় দফায় বড় অঙ্কের উল্লম্ফন ঘটেছে। সব মিলিয়ে এক দিনেই স্বর্ণের দাম ভরিতে বেড়েছে ৬ হাজার ৫৯০ টাকা। নতুন এই সমন্বয়ের ফলে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২২ ক্যারেটের এক ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৪১ হাজার টাকার মাইলফলক ছাড়িয়ে গেছে।
শনিবার সকাল ১০টা থেকে বাজুসের প্রথম দফা সমন্বয় কার্যকর হয়। সে সময় ভরিতে ২ হাজার ১৫৭ টাকা বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৩৭ হাজার ১২ টাকা। কিন্তু বাজারের অস্থিরতা এবং তেজাবি স্বর্ণের (পিওর গোল্ড) মূল্য অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় বিকেল ৪টার দিকে ফের জরুরি বিজ্ঞপ্তি দেয় বাজুস। দ্বিতীয় দফায় ভরিতে আরও ৪ হাজার ৪৩৩ টাকা বাড়ানো হয়। ফলে দিন শেষে স্বর্ণের দামের মোট বৃদ্ধি দাঁড়াল ৬ হাজার ৫৯০ টাকা।
স্বর্ণের দামের এই ঘন ঘন পরিবর্তন সাধারণ ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত মাত্র তিন মাসে দেশের বাজারে মোট ৪৯ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮ বার দাম বাড়ানো হয়েছে এবং ২১ বার কমানো হয়েছে।
তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, বিগত ২০২৫ সালটিও ছিল স্বর্ণের বাজারের জন্য অত্যন্ত অস্থির। গত বছর মোট ৯৩ বার দাম সমন্বয় করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৬৪ বারই ছিল দাম বৃদ্ধির খবর। বর্তমান গতিপ্রকৃতি দেখে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ২০২৬ সালে অস্থিরতার এই রেকর্ড ভেঙে যেতে পারে।
বাজুসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের সরবরাহ সংকট এবং এর আকাশচুম্বী মূল্যের কারণেই তারা এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। তবে এর পেছনে আরও কিছু গভীর কারণ রয়েছে:
১. বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের বিপরীতে স্বর্ণের চাহিদা বৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী এর দামকে প্রভাবিত করছে।
২. বিনিয়োগকারীদের প্রবণতা: মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কায় অনেক বিনিয়োগকারী নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণ মজুত করছেন। যদিও সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, বর্তমান অস্থিরতায় স্বর্ণ ‘সেফ হ্যাভেন’ হিসেবে কিছুটা বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে, তবুও স্থানীয় বাজারে এর প্রভাব প্রবল।
৩. তেজাবি স্বর্ণের দুষ্প্রাপ্যতা: দেশের বাজারে নতুন স্বর্ণ আমদানির চেয়ে পুরনো বা তেজাবি স্বর্ণের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি হওয়ায় এর দাম বাড়লে সরাসরি জুয়েলারি পণ্যের দাম বেড়ে যায়।
স্বর্ণের বাজারে যখন আগুনের আঁচ, তখন রুপার বাজারে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। স্বর্ণের দাম দফায় দফায় বাড়লেও রুপার দাম অপরিবর্তিত রেখেছে বাজুস। বর্তমানে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি রুপা ৫ হাজার ৩৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চলতি বছর রুপার দাম ২৯ বার সমন্বয় করা হলেও আজকের ঝড়ে এটি স্থির রয়েছে।
স্বর্ণের এই আকাশছোঁয়া দামের ফলে সাধারণ মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে এই মূল্যবান ধাতু। বিশেষ করে বিয়ের মৌসুমে অলংকার তৈরিতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। অনেক জুয়েলারি ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, ঘন ঘন দাম পরিবর্তনের ফলে তারা নতুন অর্ডার নিতে সমস্যায় পড়ছেন। ক্রেতারা বুকিং দেওয়ার পর দাম বেড়ে গেলে অনেক ক্ষেত্রে লেনদেনে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা না কমলে এবং স্থানীয় সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত না হলে স্বর্ণের দাম কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ। বাজুস জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তারা নিয়মিত দাম সমন্বয় করবে। তবে এক দিনে দুই দফা বৃদ্ধির এই ঘটনা বাজারে একটি ভীতি ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করেছে।
শনিবারের এই ডাবল-জাম্প স্বর্ণের বাজারকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ২ লাখ ৪১ হাজার টাকার ভরি সাধারণ মানুষের কাছে এখন অনেকটা অলীক স্বপ্নের মতো। এখন দেখার বিষয়, পরবর্তী কয়েক দিনে দাম কি আরও নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে নাকি বড় কোনো পতনের মাধ্যমে বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরবে।
এএন