বাংলাদেশ সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে অনুমোদন লাভ করেছে। বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বিশেষ সভায় নতুন অর্থবছরের আর্থিক রূপরেখাটি চূড়ান্ত সম্মতি পায়।
দেশের ইতিহাসে এটি ৫৫তম বাজেট। নিয়ম অনুযায়ী, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এই প্রস্তাবিত বাজেটে সম্মতি জানিয়ে স্বাক্ষর করবেন। এরপর আজ বিকেলেই জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিশাল বাজেট পেশ করবেন, যা আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন অর্থবছর হিসেবে কার্যকর হতে যাচ্ছে।
বাজেটের মূল চালিকাশক্তি, ব্যয়ের বিশাল পরিধি
চলতি বছরের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের মোট আকার নির্ধারণ করা হয়েছে '৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ ব্যয় বরাদ্দের বাজেট।
সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা সচল রাখা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর প্রসার, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে এই বিশাল ব্যয়ের খাত প্রস্তুত করা হয়েছে। জনস্বার্থ রক্ষা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সংস্কার গতিশীল রাখাই এই বাজেটের মূল লক্ষ্য বলে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল থেকে আভাস পাওয়া গেছে।
আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ও ঘাটতির খতিয়ান
বিশাল এই ব্যয়ের বিপরীতে সরকারের নিজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রাও এবার বেশ উচ্চাভিলাষী। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে '৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং অন্যান্য খাত থেকে এই অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
তবে মোট ব্যয় ও সম্ভাব্য আয়ের হিসাব কষলে দেখা যাচ্ছে, নতুন অর্থবছরে বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়তে যাচ্ছে দেশের অর্থনীতি। আয় ও ব্যয়ের মধ্যবর্তী এই ব্যবধান বা সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে '২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এ বাজেটে সরকারের প্রাক্কলিত রাজস্ব আয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। সরকার জানিয়েছে, এ ঘাটতি পূরণে দ্বিমুখী অর্থায়ন কৌশল গ্রহণ করা হবে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ গ্রহণের পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা হবে।
২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল আর্থিক ঘাটতি মোকাবিলা করা নতুন অর্থবছরের জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই ঘাটতি পূরণে সরকার মূলত দুটি প্রধান উৎসের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে:
১. অভ্যন্তরীণ উৎস (ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র)
ঘাটতির সিংহভাগ বা '১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণ এবং জনসাধারণের কাছে সঞ্চয়পত্র ও বন্ড বিক্রির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে যেন বাধাগ্রস্ত না করে, সেদিকে নজর রাখা জরুরি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
২. বৈদেশিক উৎস (ঋণ ও অনুদান)
ঘাটতি মেটানোর বাকি অংশ অর্থাৎ '১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা, বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা (যেমন- বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, আইএমএফ) এবং বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে স্বল্প সুদে ঋণ ও অনুদান পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী সরকার।
নতুন অর্থবছরের যাত্রা ও কার্যকারিতা
সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী, আজ বিকেলে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কর্তৃক বাজেট উপস্থাপনের পর সংসদ সদস্যরা এর ওপর দীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্কে অংশ নেবেন।
জুন মাস জুড়ে এই চুলচেরা বিশ্লেষণের পর ৩০ জুনের মধ্যে বাজেটটি সংসদে পাস হবে। পরবর্তীতে আগামী ১ জুলাই ২০২৬,থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন বাজেট বাস্তবায়ন শুরু হবে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে এক নতুন ধাপে নিয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এএন