রাজধানীতে নিত্যপণ্যের দাম লাগামছাড়া, বিপাকে সাধারণ মানুষ

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জুলাই ২৪, ২০২৬, ০৩:৫০ পিএম

টানা মৌসুমি বৃষ্টিপাত, দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা, ক্ষেতের ফসলের ক্ষতি এবং পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্নের প্রভাবে রাজধানীর কাঁচাবাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ কমে গেছে। এর ফলে কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, শাকসবজি, মাছ, মুরগি ও ডিমসহ প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ক্রেতারা।

শুক্রবার (২৪ জুলাই) রাজধানীর কারওয়ান বাজার, নিউমার্কেট, মোহাম্মদপুর টাউন হলসহ বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

বাজারে দেখা যায়, অধিকাংশ সবজির দাম এখন কেজিতে ৮০ থেকে ১৬০ টাকার মধ্যে। অনেক সবজির দাম ১০০ টাকার নিচে নেই। কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২৮০ থেকে ৩০০ টাকায়। টমেটো ১৬০ টাকা, গাজর ১৩০ থেকে ১৬০ টাকা, বরবটি ১২০ টাকা, করলা ১২০ থেকে ১৫০ টাকা, উচ্ছে ১৪০ টাকা, লম্বা বেগুন ১২০ টাকা, গোল বেগুন ১৬০ টাকা, শসা ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, কচুর লতি ১০০ টাকা, কাঁকরোল ১২০ টাকা এবং ঢ্যাঁড়শ, ঝিঙা ও চিচিঙ্গা ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লাউয়ের দাম প্রতি পিস ১০০ টাকা এবং জালি ৮০ টাকা।

তবে সবজির মধ্যে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হচ্ছে পেঁপে ও পটল। প্রতি কেজি পেঁপে ৪০ টাকা এবং পটল ৬০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে কাঁচা মরিচে। কয়েকদিন আগেও যে মরিচ ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতো, তা এখন ২৮০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অনেক বাজারে ১০০ গ্রাম মরিচ কিনতে গুনতে হচ্ছে ৩০ টাকা।

পেঁয়াজের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। কয়েকদিন আগেও মানভেদে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়া পেঁয়াজ এখন ৫০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বাজারেও পাঁচ কেজির পাল্লা ২৬০ থেকে ২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত সপ্তাহে ছিল ২০০ থেকে ২২০ টাকার মধ্যে।

ডিম ও মুরগির দামও বেড়েছে। ফার্মের ডিমের ডজন এখন ১৪০ টাকা, যা কিছুদিন আগেও ১৩০ টাকায় পাওয়া যেত। ব্রয়লার মুরগি কেজিপ্রতি ১৯০ থেকে ২১০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মাছের বাজারেও একই চিত্র। দুই থেকে আড়াই কেজি ওজনের রুই মাছ, যা আগে ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতো, এখন ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তেলাপিয়া ২৪০ থেকে ২৬০ টাকা এবং পাঙাশ ২২০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চাষের চিংড়ির দাম ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। পাবদা মাছের কেজি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা।

সাপ্তাহিক ছুটিতে বাজার করতে আসা সরকারি চাকরিজীবী হায়দার আলী বলেন, কয়েকদিন ধরেই সবজির দাম বাড়ছিল, তবে আজ এসে আরও বেশি দাম দেখেছেন। তার ভাষ্য, এখন ১০০ টাকার নিচে কোনো সবজি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। কাঁচা মরিচের দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। বর্ষায় কিছুটা দাম বাড়তে পারে, কিন্তু বাজারে কার্যকর নজরদারির অভাব থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

মোহাম্মদপুরের এক বেসরকারি চাকরিজীবী অলিউল আহমেদ বলেন, আগে ৫০০ টাকায় যে পরিমাণ বাজার করা যেত, এখন একই জিনিস কিনতে প্রায় দ্বিগুণ টাকা লাগছে। প্রতি সপ্তাহেই বাজারের দামে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

রামপুরা বাজারে কেনাকাটা করতে আসা মাসুদ রানা বলেন, আগে অন্তত ৮০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে বেশ কিছু সবজি পাওয়া যেত। এখন অধিকাংশ সবজির দাম ১০০ টাকার বেশি। সবজিই যদি এত দামে কিনতে হয়, তাহলে মাছ বা মাংস কেনা অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।

আরেক ক্রেতা আনিসুর রহমান বলেন, আগে থেকেই নিত্যপণ্যের দাম বেশি ছিল। এখন বৃষ্টি ও বন্যার কারণ দেখিয়ে মাছের দামও বাড়ানো হয়েছে। এতে সীমিত আয়ের মানুষের সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

বিক্রেতাদের দাবি, দেশের বিভিন্ন উৎপাদন এলাকা-বিশেষ করে পাবনা, ফরিদপুর ও কুষ্টিয়া থেকে পেঁয়াজ এবং অন্যান্য কৃষিপণ্য পরিবহনে টানা বৃষ্টির কারণে সমস্যা তৈরি হয়েছে। অনেক স্থানে গাড়ি চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সরবরাহ কমে গেছে।

পেঁয়াজ বিক্রেতা নিশান আহমেদ বলেন, মোকাম থেকেই বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। সেই বাড়তি খরচের প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়েছে। তবে তিনি অভিযোগ করেন, কিছু ব্যবসায়ী পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দামও হাঁকাচ্ছেন।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, আবহাওয়া পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে আগামী কয়েকদিনও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।

এম জি