সেবা খাতের কবলে অর্থনীতি, ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় শঙ্কা

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: জুন ২০, ২০২৬, ০৯:৩৭ পিএম

দেশের পৌনে চার কোটি মানুষ এখন কর্মব্যস্ত হলেও তাদের সিংহভাগই জড়িয়ে আছেন কেনাবেচা কিংবা সাধারণ চাকুরির মতো সেবা খাতে। এর বিপরীতে দেশের উৎপাদন শিল্প বা কারখানার চাকা ঘুরছে অত্যন্ত মন্থর গতিতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সবশেষ অর্থনৈতিক শুমারি এমন এক তথ্য সামনে এনেছে, যা দেশের টেকসই অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি করেছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানের ৯১ শতাংশই এখন একচ্ছত্রভাবে দোকানপাট, শোরুম, হোটেল-রেস্তোরাঁর মতো সেবা খাতের দখলে। অন্যদিকে পণ্য উৎপাদন করার প্রকৃত কারখানা বা উৎপাদনমুখী খাতের অবদান মাত্র ৯ শতাংশের কাছাকাছি। একসময় যে অর্থনীতি কৃষি বা ছোট উৎপাদন খাতের ওপর ভর করে দাঁড়িয়েছিল, তা আজ চলে গেছে সেবা খাতের পকেটে।

অর্থনীতির এই রূপান্তরের নেপথ্যে কোনো স্বাভাবিক বিকাশ নেই, বরং আছে প্রাতিষ্ঠানিক দীর্ঘশ্বাস। মূলত, শিল্পায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো সর্বগ্রাসী দুর্নীতি আর চরম অব্যবস্থাপনা। লাইসেন্স পাওয়ার অন্তহীন জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সংকট আর পদে পদে ঘুষের আগ্রাসনে যখন কোনো কারখানা গড়ার স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়, তখন উদ্যোক্তারা বাধ্য হয়ে সেবা খাতকে বেছে নিচ্ছেন।

উন্নয়ন অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী, একটি দেশের অর্থনীতি স্বাভাবিক নিয়মে কৃষি থেকে প্রথমে শিল্পে এবং শিল্পের হাত ধরে পরবর্তীতে উন্নত সেবা খাতে স্থানান্তরিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শিল্পের পূর্ণ বিকাশ ঘটার আগেই তা সরাসরি সেবা খাতে লাফ দিয়েছে। পর্যাপ্ত শিল্পায়ন ছাড়া পুরোপুরি সেবা খাতের ওপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি করে।

কারখানার প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন যেভাবে দ্রুত বাড়ানো সম্ভব, সেবা খাতে উৎপাদনশীলতা ব্যাপক হারে বাড়ানোর সুযোগ সেভাবে থাকে না। তাছাড়া, শিল্প খাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার আয় করে। এর বিপরীতে অভ্যন্তরীণ সেবা খাত দেশের ভেতরের টাকাকেই শুধু ঘুরপাক খেলায়, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি করে।

দেশের কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের এই নাজুক কাঠামোগত দুর্বলতার কথা ফুটে উঠেছে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণেও। তাঁদের মতে, আমাদের কর্মসংস্থানের বড় একটি সমস্যা হলো, নারীদের একটা বড় অংশ এবং বিপুলসংখ্যক বেকার ও প্রশিক্ষণহীন তরুণ শ্রমশক্তির বাইরে রয়ে গেছেন। আবার যারা কাজ করছেন, তাদের মধ্যেও খাতের ভারসাম্য নেই।

দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ এখনো কৃষিতে কাজ করলেও জাতীয় আয়ে এর অবদান মাত্র ১২ শতাংশ। অর্থাৎ, কৃষিতে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি মানুষ নিয়োজিত থাকায় শ্রমের উৎপাদনশীলতা মারাত্মকভাবে কম এবং এখানে এক বিশাল প্রচ্ছন্ন বেকারত্ব বা ছদ্ম বেকারত্ব লুকিয়ে আছে। এই বন্ধ্যাত্ব দূর করতে হলে কৃষিজাত পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আধুনিক কৃষিভিত্তিক শিল্প কারখানা ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে।

তৈরি পোশাকের বাইরে আমাদের দেশে বড় সম্ভাবনা রয়েছে ওষুধ, সেমিকন্ডাক্টর এবং বিশেষ করে চামড়া ও জুতা শিল্পে। চামড়া খাতের নিজস্ব কাঁচামালের মান পৃথিবীর অন্যতম সেরা এবং এর মূল্য সংযোজনের ক্ষমতা তৈরি পোশাকের চেয়েও বেশি। কিন্তু আমলাতান্ত্রিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনার খেসারত হিসেবে এই বিপুল সম্ভাবনাময় খাতটি আজ সংকটের মুখে।

বর্তমানে দেশের প্রায় তিন কোটিরও বেশি মানুষ এই অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞের পেছনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। এর মধ্যে মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৭৭ শতাংশ মানুষই নিয়োজিত আছেন বিভিন্ন স্থায়ী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে, যা প্রমাণ করে বেসরকারি বিনিয়োগই এখন আমাদের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু এই মানবসম্পদকে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীল খাতে কাজে লাগাতে না পারা একটি বড় জাতীয় অপচয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সেবা খাতের এই একচ্ছত্র আধিপত্য দিয়ে বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য উচ্চ আয়ের স্থায়ী কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা অসম্ভব। একটি পোশাক কারখানা, ওষুধ শিল্প বা ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন কেন্দ্রে যেখানে একসঙ্গে হাজার হাজার তরুণের স্থায়ী কর্মসংস্থান হয়, সেখানে একটি সাধারণ শোরুম বা দোকানে বড়জোর পাঁচ থেকে দশ জনের কর্মসংস্থান হয়, যার পরিধি অত্যন্ত সীমিত।

সেবা খাতের এই সাময়িক জয়জয়কারের দিনে তাই নীতিনির্ধারকদের অলস বসে থাকার সুযোগ নেই। আমাদের আদি ভিত্তি কৃষিনির্ভর শিল্প কিংবা বিপুল সম্ভাবনার চামড়া শিল্প গড়ে তুলতে নতুন উদ্যোক্তাদের বিশেষ নীতি সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে কারখানার চাকা ঘোরানোর দিকে ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।

তবে তার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্যবসায়িক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতির আমূল পরিবর্তন করে একটি স্বচ্ছ পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেন উদ্যোক্তারা বড় ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে সাহস পান। কাউন্টারের টেবিল আর দোকানের ঝাঁপ ফেলার মানসিকতা ছেড়ে যেদিন আমাদের তরুণদের শ্রম ও মেধা উৎপাদনমুখী কারখানার চাকা ঘোরাতে শুরু করবে, সেদিনই নির্মিত হবে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই অর্থনীতির মজবুত ভিত্তি।

জেএইচআর