সিইসি নাসির উদ্দিন

চ্যালেঞ্জ বড় হলেও আমাদের প্রস্তুতি দৃঢ়

বিশেষ প্রতিনিধি প্রকাশিত: নভেম্বর ২২, ২০২৫, ১০:৪১ পিএম

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন যখন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সরগরম, ঠিক সেই মুহূর্তে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সামনে যোগ হয়েছে আরও নতুন ও জটিল দায়িত্ব একই দিনে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ইসিকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।

শনিবার রাজধানীর গুলশানে এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনের উদ্যোগে আয়োজিত একটি কর্মশালায় অংশ নিয়ে সিইসি এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, একসঙ্গে দুটি জাতীয় গুরুত্বের আয়োজন পরিচালনা করা নির্বাচন কমিশনের জন্য নিঃসন্দেহে বড় চ্যালেঞ্জ। এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি পূর্ববর্তী কোনো নির্বাচন কমিশনকে কখনো পড়তে হয়নি।

সিইসি জানান, গণভোট আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। 'আগামী সপ্তাহেই গণভোট সংক্রান্ত আইন পাস হবে বলে আমাদের জানানো হয়েছে। আইনটি কার্যকর হলে কমিশন সঙ্গে সঙ্গেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করবে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, গণভোটের আইনি কাঠামো দীর্ঘদিন আলাপ আলোচনার বিষয় ছিল। এবার প্রথমবারের মতো নির্বাচন কমিশনকে জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি এই নতুন প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে। ফলে প্রশাসনিক সমন্বয়, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি, ভোটগ্রহণ পদ্ধতি, ব্যালট ব্যবস্থাপনা সব ক্ষেত্রেই দ্বিগুণ প্রস্তুতি প্রয়োজন হবে।

নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে আয়োজনের সিদ্ধান্তকে 'দায়িত্বের সবচেয়ে কঠিন পর্যায়' বলে অভিহিত করেন নাসির উদ্দিন। 

তিনি বলেন, একই দিনে ভোট ও গণভোট দুটিই আইনসম্মতভাবে, নিরপেক্ষভাবে এবং স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করা সহজ কাজ নয়। কিন্তু আমাদের সামনে দ্বিতীয় কোনো বিকল্প নেই। আইন যেটা বলবে, কমিশন সে পথেই চলবে।

তিনি আরও বলেন, আগের কোনো নির্বাচন কমিশন যে পরিমাণ চাপ বা সংকটের সম্মুখীন হয়নি, বর্তমান কমিশনকে তার চেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। রাজনৈতিক পরিবেশ, বিভিন্ন মহলের প্রত্যাশা, মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি সব মিলিয়ে এটিকে ‘ন্যায়সঙ্গত নির্বাচন ব্যবস্থাপনার কঠিনতম অধ্যায়’ হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি।

সিইসি জানান, গত কয়েকদিনে তিনি সরাসরি উপলব্ধি করেছেন যে জনগণের প্রত্যাশা এবার অসাধারণ উচ্চতায় পৌঁছেছে।

তিনি বলেন, মাত্র দুই–তিন দিনের মধ্যেই বুঝেছি, মানুষ এবার নির্বাচন নিয়ে কতটা আন্তরিক, কতটা প্রত্যাশিত। তাদের বিশ্বাস একটি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন দেশের পরিস্থিতিতে শান্তি ও স্থিতি ফিরিয়ে আনবে।

নির্বাচনকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে আগ্রহ, আলোচনা ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা নির্বাচন কমিশনের ওপর বাড়তি দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে সিইসি বলেন, আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতা কখনোই খুব সরল নয়। বিভিন্ন মত, দ্বন্দ্ব, অবস্থান সবকিছুই আমাদের বাস্তবতার অংশ। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি স্বচ্ছ নির্বাচন হলে উত্তেজনা কমে যাবে, পরিস্থিতি স্থিতিশীল হবে।

তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন, রাজনৈতিক নেতারা দায়িত্বশীল আচরণ করবেন এবং গণতন্ত্রের সুষ্ঠু চর্চার পরিবেশ বজায় রাখতে সহযোগিতা করবেন।

নাসির উদ্দিন স্পষ্ট করে বলেন, আমাদের লক্ষ্য কেবল একটি স্বচ্ছ, শান্তিপূর্ণ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার এর বেশি কিছু নয়, কমও নয়।

তিনি জানান, রাজনৈতিক দলগুলোকেও এ বিষয়ে একই ধরনের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। কমিশন দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

ইসির কর্মকর্তারা মনে করছেন, একদিনে দুটি জাতীয় কার্যক্রম আয়োজনে অনেক বাড়তি প্রস্তুতির প্রয়োজন হবে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, ব্যালট পেপারের দু’ধরনের নকশা ও মুদ্রণ, ভোটকেন্দ্রে অতিরিক্ত বুথের ব্যবস্থা, দ্বৈত প্রক্রিয়ার জন্য প্রশিক্ষিত জনবল, পরিবহন ও নিরাপত্তার বিশেষ সমন্বয়, ফলাফল সংগ্রহ ও গণনার জন্য আলাদা প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা।

সিইসি বলেন, দুইটি নির্বাচন আয়োজন নয়, বরং একটি জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে সঠিকভাবে পরিচালনা করাই আমাদের মুখ্য দায়িত্ব।

তিনি আরও যোগ করেন যে, ইসির নিজস্ব প্রশাসনিক দক্ষতা, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতা মিলিয়েই সবকিছু সম্ভব হবে।

এদিন অনুষ্ঠিত কর্মশালাটি ছিল আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাদের সামনে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি উপস্থাপনার একটি অংশ।

সিইসি বলেন, স্বাধীন পর্যবেক্ষকরা নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং কমিশন তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখবে।

সিইসি বারবার উল্লেখ করেন যে নির্বাচন কমিশনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনগণের আস্থা।

তিনি বলেন, আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রক্রিয়া এবং কার্যক্রম হবে দৃষ্টিগোচর এবং আইনের আওতায়। জনগণ যাতে বুঝতে পারে যে ভোটের প্রতিটি ধাপ নিখুঁতভাবে পরিচালিত হচ্ছে এটাই আমাদের অঙ্গীকার।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার আরও বলেন, চ্যালেঞ্জ বড় হলেও আমাদের প্রস্তুতি দৃঢ়। নির্বাচনী পরিবেশ পরিষ্কার, প্রতিযোগিতা সুষ্ঠু এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করাই হবে আমাদের মূল লক্ষ্য।

তিনি আবারও জোর দিয়ে বলেন যে, রাজনৈতিক অস্থিরতার যেকোনো আশঙ্কা একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়েই কাটিয়ে উঠা সম্ভব।

ইএইচ