আগামী অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশনের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) ও পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সরকারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় সম্পন্ন হলে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেই ভোট আয়োজনের সব প্রস্তুতি শেষ করা সম্ভব হবে।
রাজধানীর নির্বাচন ভবনে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, বর্তমানে স্থানীয় সরকারের প্রায় সব স্তরের নির্বাচন বাকি রয়েছে। সংবিধান ও আইনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এসব নির্বাচন পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করা প্রয়োজন। সে লক্ষ্যেই কমিশন অক্টোবরকে সামনে রেখে প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম শুরু করেছে।
তিনি জানান, কোন স্তরের নির্বাচন আগে হবে সে বিষয়ে এখনো কমিশনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে বাস্তবতা এবং প্রশাসনিক প্রয়োজন বিবেচনায় ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন দিয়েই কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ উপজেলা পরিষদ গঠনের ক্ষেত্রে ইউপি ও পৌরসভা নির্বাচনের গুরুত্ব রয়েছে। তাই এ দুটি নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দিকে এগোনোর পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার বলেন, ভোটের সময় নির্ধারণে একাধিক বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে পাবলিক পরীক্ষা, ধর্মীয় উৎসব, বর্ষা মৌসুম এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভৌগোলিক ও যোগাযোগ পরিস্থিতি। এসব দিক পর্যালোচনা করেই চূড়ান্ত তফসিল ঘোষণা করা হবে।
সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি এবং সরকারের পক্ষ থেকেও কমিশনের কাছে কোনো চিঠি আসেনি। তবে কমিশন নিজস্ব উদ্যোগে প্রস্তুতির কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। প্রয়োজনীয় সমন্বয় শুরু হলে অল্প সময়ের মধ্যেই নির্বাচন আয়োজনের জন্য কমিশন প্রস্তুত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সব ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করতে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে বলেও জানান আব্দুর রহমানেল মাছউদ। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচন পর্যায়ক্রমে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে আইন, বিধিমালা ও আচরণবিধি সংশোধনের কাজও প্রায় শেষ করেছে। আচরণবিধির খসড়া ইতোমধ্যে কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের মতামত সংগ্রহের পর প্রয়োজনীয় সংযোজন-বিয়োজন করে চূড়ান্ত করা হবে।
তিনি আরও জানান, সংশোধিত বিধিমালায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বাড়ানো হবে। অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ থাকছে না। আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হবে না। পাশাপাশি পোস্টাল ব্যালট ও জাতীয় নির্বাচনের মতো পোস্টার ব্যবহারের ব্যবস্থাও থাকছে না।
বর্তমানে সাড়ে চার হাজারের বেশি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান নির্বাচন কমিশনার। তিনি বলেন, নির্বাচন পরিচালনায় প্রাথমিকভাবে পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। অঞ্চলভিত্তিকভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং প্রতিটি ধাপের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরবর্তী ধাপের নিরাপত্তা পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমের কাছে গ্রহণযোগ্য হিসেবে মূল্যায়িত হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সেই মান বজায় রাখতে কমিশন সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। এজন্য রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গণমাধ্যম এবং ভোটারদের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।
আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, অতীতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনগুলোতে স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে তুলনামূলক বেশি সংঘাত ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এবার শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট গ্রহণ নিশ্চিত করতে কমিশন বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
এদিকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি সংসদে জানিয়েছেন, অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরু করেছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এএন