আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ ও গণভোট ২০২৬ সামনে রেখে পোস্টাল ব্যালট পেপারের নকশায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। বিদেশে থাকা ভোটারদের জন্য ব্যবহৃত ব্যালটের মতো দেশের অভ্যন্তরে ব্যবহৃত পোস্টাল ব্যালটে আর নিবন্ধিত সকল রাজনৈতিক দলের প্রতীক থাকছে না। এর পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার চূড়ান্ত প্রার্থীদের নাম ও প্রতীক সংবলিত সংক্ষিপ্ত ও সহজবোধ্য ব্যালট তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।
শুক্রবার রাতে নির্বাচন কমিশনের এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। মূলত ভোটারদের বিভ্রান্তি দূর করতে এবং ভোটদান প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি ভোটারদের জন্য যে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়, সেখানে সাধারণত নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত সকল দলের নাম ও প্রতীক থাকে। কারণ বিদেশে পাঠানোর সময় নির্দিষ্ট আসনের চূড়ান্ত প্রার্থীর তালিকা অনেক সময় হাতে থাকে না। কিন্তু দেশের ভেতরে যারা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেবেন, তাদের জন্য এই সব প্রতীক পদ্ধতিটি বিভ্রান্তিকর হতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক দলগুলো।
বিশেষ করে গত বৃহস্পতিবার বিএনপির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নির্বাচন কমিশনের সাথে বৈঠক করে এই পদ্ধতিতে পরিবর্তনের জোরালো প্রস্তাব দেয়। তাদের দাবি ছিল, দেশের অভ্যন্তরে ব্যবহৃত ব্যালটে অপ্রয়োজনীয় সব প্রতীক না রেখে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নাম ও প্রতীক রাখা হোক। নির্বাচন কমিশন এই যুক্তির সাথে একমত পোষণ করে ব্যালট নকশা পরিবর্তনের পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেয়।
বিএনপির অভিযোগ ও প্রস্তাবনা গত বৃহস্পতিবার দুপুরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সাথে দীর্ঘ বৈঠক করেন।
বৈঠক শেষে সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, পোস্টাল ব্যালট দেশের অভ্যন্তরে বিপুল সংখ্যক ভোটার ব্যবহার করবেন। সেখানে সব মার্কা বা প্রতীক রাখা হলে সাধারণ ভোটাররা বিভ্রান্ত হতে পারেন।
আমরা স্পষ্ট প্রস্তাব দিয়েছি, ব্যালট যেন সহজ হয় এবং সেখানে কেবল সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের নাম ও প্রতীক থাকে। নির্বাচন প্রক্রিয়াকে কঠিন না করে ভোটাধিকার প্রয়োগ সহজ করা কমিশনের দায়িত্ব।
একই বৈঠকে বিএনপির আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান একটি গুরুতর অভিযোগ তোলেন। তিনি দাবি করেন, নির্বাচনের বিশেষ কিছু রাজনৈতিক দলকে অন্যায্য সুবিধা দেওয়ার জন্য পোস্টাল ব্যালটের প্রথম লাইনে দাঁড়িপাল্লা, হাতপাখা ও শাপলা কলির মতো প্রতীকগুলোকে রাখা হয়েছে। এই বিন্যাস পরিবর্তনের দাবিও জানান তারা।
তবে নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগের বিপরীতে জানিয়েছে, ব্যালট পেপারে প্রতীকের ক্রমধারা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারি গেজেটের ধারাবাহিকতা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে। এখানে কোনো বিশেষ দলকে সুবিধা দেওয়ার অবকাশ নেই।
পোস্টাল ব্যালটে ভোটার সংখ্যা ও পরিসংখ্যান এবারের নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে ভোটদানের জন্য উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার আবেদন করেছেন। কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে মোট নিবন্ধন করেছেন ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন ভোটার। এর মধ্যে দেশের ভেতরে বসবাসরত এবং পোস্টাল ব্যালটের সুবিধাভোগী ভোটারের সংখ্যা ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪১ জন। বাকি ভোটাররা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।
আইন অনুযায়ী কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণির ভোটার সরাসরি ভোটকেন্দ্রে না গিয়ে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছেন নির্বাচনী কর্মকর্তা ও কর্মচারী, যারা ভোটের দিন নিজ ভোটার এলাকার বাইরে নির্বাচনী দায়িত্বে থাকবেন।
দ্বিতীয়ত সরকারি চাকরিজীবী যারা নিজ এলাকার বাইরে অন্য জেলায় কর্মরত আছেন। এছাড়া কারাগারে আটক বা বিচারিক হেফাজতে থাকা ভোটাররাও এই সুবিধা পাবেন।
কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত দ্রুতই আনুষ্ঠানিক রেজুলেশন আকারে পাস করা হবে। এরপর দেশের সকল জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের নতুন নকশার ব্যালট পেপার ছাপানোর নির্দেশনা দেওয়া হবে। যেহেতু ভোটগ্রহণের আর খুব বেশি সময় বাকি নেই, তাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই কাজ সম্পন্ন করতে চায় কমিশন।
নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য করতে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর যৌক্তিক দাবিগুলোকে গুরুত্বের সাথে নিচ্ছে, যা ইতিবাচক বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। পোস্টাল ব্যালটের এই নকশা পরিবর্তন মূলত সাত লাখের বেশি ভোটারের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
জেএইচআর