রংপুরে ৩৩ আসনে ২৩৫ প্রার্থীর মধ্যে নারী ৯, তৃতীয় লিঙ্গ ১ জন

শরিফুল ইসলাম, রংপুর প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৮, ২০২৬, ০৪:৪৭ পিএম

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনে ভোটযুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৩৫ জন। এর মধ্যে ৮টি সংসদীয় আসনে লড়ছেন ৯ নারী। স্বতন্ত্র নারী প্রার্থী রয়েছেন ৪ জন।

এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী থেকে একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে আছেন আনোয়ারা ইসলাম রানী।

জাতীয় নির্বাচনে রংপুর বিভাগে নারীর অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে বাড়লেও এখনো তা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবার নারীদের অংশগ্রহণ কমেছে। 

সবশেষ চারটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একাদশ সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত নারীরা সংখ্যাগতভাবে পিছিয়ে থাকলেও দ্বাদশ নির্বাচনে অংশগ্রহণ ছিল ঊর্ধ্বমুখী। ওই নির্বাচনে ১৫ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

নির্বাচন কমিশন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনে নারীর অংশগ্রহণ ছিল খুবই কম। ওই নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের ভোট বর্জনের কারণে অধিকাংশ আসনে একক নির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনে অংশ নিয়ে শুধু গাইবান্ধা-২ থেকে মাহাবুব আরা গিনি আর রংপুর-৬ আসনে বিজয়ী হন স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরী।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও রংপুরের ৩৩টি আসনের মধ্যে রংপুর-৩ আসন থেকে রিটা রহমান, রংপুর-৬ আসন থেকে শিরিন শারমিন চৌধুরী এবং গাইবান্ধা-২ আসন থেকে মাহাবুব আরা গিনি প্রার্থী হয়েছিলেন। তবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়। 

বিভাগের ৩৩টি আসনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ২৩ জন নারী। যাচাই-বাছাই, প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে ভোটে ছিলেন ১৫ জন।

এর মধ্যে নির্বাচনে রংপুর-৬ আসনে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, গাইবান্ধা-৩ আসনে উম্মে কুলসুম স্মৃতি এবং গাইবান্ধা-১ আসনে আব্দুল্লাহ নাহিদ নিগার নির্বাচিত হয়েছিলেন। যদিও বিএনপিবিহীন অনুষ্ঠিত ওই তিনটি নির্বাচন নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে।

এদিকে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২ এর তৃতীয় সংশোধনী অনুসারে, রাজনৈতিক দলগুলোকে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সব পদে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী রাখার কথা বলা হয়েছিল। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। কোনো বড় রাজনৈতিক দল এই বাধ্যবাধকতা পালন করতে পারেনি বা করছে না।

দলগুলোকে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সব কমিটির পদে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী রাখার ব্যাপারে ২০২১ সালে নির্বাচন কমিশনের সময়সীমা ২০৩০ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল।

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সংসদে প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাথে আলোচনায় ৫ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দেওয়ার প্রস্তাবে অধিকাংশ দল একমত হয়। এবারের নির্বাচনে ৫ শতাংশ মনোনয়ন দেওয়ার ব্যবস্থা রেখে জুলাই সনদ চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু দলগুলো কথা রাখেনি।

বিএনপি ৫ শতাংশ নারী মনোনয়নের কথা বললেও এবার নির্বাচনে দলটি তা মানেনি। তাদের মোট প্রার্থীর ৩ দশমিক ৫ শতাংশ নারী। আর জামায়াতে ইসলামী কোনো আসনেই নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি। এ নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। দ্বাদশ এবং ত্রয়োদশ এই দুই নির্বাচনে ৩৩টি আসনেই উল্লেখযোগ্য নারী প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীদের আগ্রহ বাড়ার ইঙ্গিত মিলছে।

দেখা গেছে, রংপুরে যেসব নারী প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেন, তাদের একটি বড় অংশ স্বতন্ত্র বা ছোট রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন। বড় রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীদের মনোনয়ন দেওয়া হয় মূলত ‘প্রতীকী আসনে’ বা এমন এলাকায়, যেখানে দলের জয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। ফলে নারী প্রার্থীর সংখ্যা বাড়লেও নির্বাচিত হওয়ার হার এক শতাংশেরও কম।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারিতে হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর বিভাগের ৫ জন নারী দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে লড়বেন। জাতীয় পার্টি থেকে রয়েছে একজন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) ২ জন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ থেকে একজন করে। এছাড়া আছে চার স্বতন্ত্র প্রার্থী।

ঠাকুরগাঁও-২ আসনে জাতীয় পার্টির নূরুন নাহার বেগম (লাঙ্গল), ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মোছা. আশা মনি (ফুটবল), দিনাজপুর-৩ আসনে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের প্রার্থী কিবরিয়া হোসেন (মই), একই আসনে বাংলাদেশ মুসলিম লীগের লায়লা তুল রীমা (হারিকেন), গাইবান্ধা-১ আসনে স্বতন্ত্র মোছা. ছালমা আক্তার (কলস), গাইবান্ধা-৫ আসনে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) এর মোছা. রাহেলা খাতুন (কাঁচি), রংপুর-৩ আসনে বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য স্বতন্ত্র রিটা রহমান (সূর্যমুখী), রংপুর-৪ আসনে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-মার্কসবাদীর প্রগতি বর্মণ তমা (কাঁচি), রংপুর-৬ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাকিয়া জাহান চৌধুরী (সূর্যমুখী) ভোটযুদ্ধে লড়ছেন।

এছাড়াও তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠী থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে এবারও রংপুর-৩ আসন থেকে হরিণ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আনোয়ারা ইসলাম রানী। এর আগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও রানী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। সে নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঈগল প্রতীক নিয়ে তিনি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২৩ হাজার ৩৩৯ ভোট পেয়েছিলেন।

এদিকে, রংপুর বিভাগের পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার আসনগুলোতে পুরুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকলেও ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতার লড়াইয়ে নেই কোনো নারী। তবে তফসিল ঘোষণার আগে ও পরে এসব জেলায় অনেকেই প্রার্থী হতে আগ্রহ প্রকাশ করে প্রচার-প্রষণায় অংশ নিয়েছিলেন।

একাধিক নারী প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দলীয় মনোনয়ন পেতে গিয়ে তাদের সবচেয়ে বড় বাধা অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সাংগঠনিক প্রভাব। একই সাথে মাঠে কাজ, জনপ্রিয়তা সব থাকলেও শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন বোর্ডে সিদ্ধান্ত হয় অন্যভাবে। সেখানে নারীর কণ্ঠ খুবই কম শোনা যায়।

সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন রংপুর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাসিমা আমিন বলেন, তৃণমূলের নারীদের ক্ষমতায়ন এবং রাজনৈতিক বিকাশে সব দলকে এগিয়ে আসতে হবে। মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ দেশের প্রতিটি আন্দোলনের সম্মুখভাগে থাকা নারীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এখন আর নারীকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নয় বরং অধিকারের দৃষ্টিভঙ্গিতে এগিয়ে যেতে সবার পাশে থাকা উচিত।

তিনি আরও বলেন, রাজনীতিতে নারীর সুযোগ বাড়াতে ৩৩ শতাংশ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। এটা একসময় জোরালো দাবি ছিল। আমরা ভেবেছিলাম জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দলগুলো ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী নিশ্চিত করবে। কিন্তু এবার সেটিও আলোর মুখ দেখল না। ভোটের মাঠে নারীদের এগিয়ে আনতে চাইলে শুধু উৎসাহ নয়, রাজনৈতিক দলের ভেতর কাঠামোগত সংস্কার জরুরি।

রংপুর-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আনোয়ারা ইসলাম রানী বলেন, এখন নারীরা আর শুধু নামকাওয়াস্তে রাজনীতিতে আসছেন না। আমরা মাঠে কাজ করছি, ভোট চাইছি। নারীদের জন্য সমান সুযোগ নেই এটাই বড় বাধা। এরপরও আমরা কাজ করছি সাধারণ মানুষের অধিকারের জন্য।

ইএইচ