নির্বাচনী প্রচারণায় পোস্টার ব্যবহারে ইসির কঠোর নিষেধাজ্ঞা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৯, ২০২৬, ০৪:০৯ পিএম

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল বর্তমান নির্বাচন কমিশন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক প্রচারণার স্বার্থে কাগজের পোস্টার ব্যবহারের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। কোনোভাবেই যাতে প্রার্থীরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করে পোস্টার ছাপাতে না পারেন, সে লক্ষ্যে দেশের সকল প্রিন্টিং প্রেস বা ছাপাখানাকে পোস্টার মুদ্রণ না করার জন্য সরাসরি নির্দেশনা দিয়েছে ইসি।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের সকল রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে এ সংক্রান্ত একটি জরুরি চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, নির্বাচনী প্রচারণার জন্য কোনো প্রার্থী বা রাজনৈতিক দল কোনো ধরণের ছাপানো পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না।

আচরণবিধি লঙ্ঘন রোধে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে ছাপাখানাগুলোর মালিকদের সাথে যোগাযোগ করতে এবং এই নির্দেশনা কঠোরভাবে পালন নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো ছাপাখানা এই আদেশ অমান্য করে পোস্টার মুদ্রণ করে, তবে তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৬’-এর আলোকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইসির মতে, যত্রতত্র পোস্টার লাগানো শহর ও গ্রামের সৌন্দর্য নষ্ট করার পাশাপাশি পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে লেমিনেটেড পোস্টার বা পলিথিন মোড়ানো পোস্টার মাটির উর্বরতা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার জন্য হুমকি স্বরূপ। এই সংকট নিরসনে কমিশন এবার ‘পোস্টারমুক্ত নির্বাচন’ অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

ইসি সূত্র জানায়, কাগজের পোস্টারের বিকল্প হিসেবে প্রার্থীরা ডিজিটাল মাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া এবং মাল্টিমিডিয়া স্ক্রিন ব্যবহার করে প্রচারণা চালাতে পারবেন। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের ডিজিটাল ক্যাম্পেইন শুরু করেছে। আজ সকালেই জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তাদের ‘মাল্টিমিডিয়া বাস’ উদ্বোধন করেছেন, যা ইসির এই আধুনিক প্রচারণার দর্শনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে। ঢাকার পুরান ঢাকার ছাপাখানা মালিকরা বলছেন, নির্বাচনী মৌসুম তাদের ব্যবসার একটি বড় সময়। পোস্টার ছাপানো বন্ধ হওয়ায় তারা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন। অন্যদিকে, অনেক প্রার্থী এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলছেন, এতে নির্বাচনী ব্যয় যেমন কমবে, তেমনি কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে পোস্টার ছেঁড়া নিয়ে যে সহিংসতা হয়, তাও বন্ধ হবে।

ইসি জানিয়েছে, নির্বাচনী এলাকায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা নিয়মিত টহলে থাকবেন। যদি কোনো প্রার্থীর পোস্টার দেয়ালে বা অন্য কোথাও দেখা যায়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে সেই প্রার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর আগে বিএনপি ও জামায়াতের মতো বড় দলগুলো ডিজিটাল প্রচারণার দিকে ঝুঁকেছে এবং তারেক রহমানসহ শীর্ষ নেতারাও জনসভার মাধ্যমে ভোটারদের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপনে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

বাংলাদেশের নির্বাচনে পোস্টার মানেই ছিল উৎসবের আমেজ। কিন্তু আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এবং পরিবেশ রক্ষার তাগিদে নির্বাচন কমিশনের এই সাহসী পদক্ষেপ রাজনীতিতে এক নতুন ধারার সূচনা করবে। পোস্টারবিহীন এই নির্বাচনে ভোটাররা প্রার্থীদের চেনার জন্য কতটুকু ডিজিটাল মাধ্যম বা ব্যক্তিগত প্রচারের ওপর নির্ভর করেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে ছাপাখানাগুলোর ওপর কড়া নজরদারি রাখার মাধ্যমে ইসি পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে যে, এবার আচরণবিধি লঙ্ঘনের কোনো সুযোগ নেই।

 এএন