রুমিন-তাহসিনা-শামাসহ সংসদে যাচ্ছেন ৭ নারী

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬, ০৯:৩২ এএম
বিজয়ী হয়ে সংসদে যাচ্ছেন ৭ নারী প্রার্থী। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের অংশগ্রহণ নিয়ে দীর্ঘদিনের যে আক্ষেপ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলে তার একটি ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা গেছে। বিশেষ করে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীদের মনোনয়ন এবং তাদের বিজয়ী হয়ে আসার হার এবার নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। 

এখন পর্যন্ত পাওয়া বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, অন্তত সাতজন নারী প্রার্থী সরাসরি ভোটে বিজয়ী হয়ে সংসদ সদস্য হিসেবে নিজেদের নাম লিখিয়েছেন।

এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়া মোট ৮৫ জন নারী প্রার্থীর মধ্যে এই সাতজনের বিজয় যেমন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এটি তৃণমূল পর্যায়ে নারী নেতৃত্বের জনপ্রিয়তারও একটি বড় প্রমাণ।

বিজয়ীদের মধ্যে বিএনপির প্রার্থী ও স্বতন্ত্র হিসেবে লড়াই করা হেভিওয়েট নারী নেত্রীরা রয়েছেন। নিচে তাদের জয়ের সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো:

দীর্ঘদিন ধরে ‘গুম’ থাকা বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা সিলেট-২ (বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর) আসনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন। তিনি ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ১৭ হাজার ৯৫৬ ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১-দলীয় জোটের মুহাম্মদ মুনতাছির আলী পেয়েছেন ৩৮ হাজার ৬৩৫ ভোট। সিলেটের ছয়টি আসনের মধ্যে তিনিই একমাত্র নারী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হলেন।

বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়াই করা রুমিন ফারহানা ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে রেকর্ড গড়েছেন। ‘হাঁস’ প্রতীক নিয়ে তিনি ১ লাখ ১৭ হাজার ৪৯৫ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি জোটের মনোনীত প্রার্থীকেও বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছেন।

মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী আফরোজা খানম ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩৪৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। সাটুরিয়া ও সদর উপজেলার ভোটাররা তাকে দুহাত ভরে সমর্থন দিয়েছেন।

ঝালকাঠি-২ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ১৩ হাজার ১০০ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তিনি জামায়াতের প্রার্থী এস এম নেয়ামুল করিমকে পরাজিত করেন।

ফরিদপুর-২ আসনে শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং ফরিদপুর-৩ আসনে নায়াব ইউসুফ আহমেদ বিএনপির টিকিটে জয়ী হয়ে ফরিদপুরের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের আধিপত্য ধরে রেখেছেন। এছাড়া নাটোর-১ আসনে ফারজানা শারমিন বিজয়ী হয়ে প্রথমবার সংসদে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের সংখ্যা মোট প্রার্থীর মাত্র ৪ শতাংশ হলেও গুণগত মানে তারা অনেক এগিয়ে ছিলেন। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণে কিছু চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। বিজয়ী ও প্রতিদ্বন্দ্বী নারী প্রার্থীদের ৭৫ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত (স্নাতক ও স্নাতকোত্তর)।

এবারের নির্বাচনে তরুণী ও মধ্যবয়সী নারীদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। ৩২ জন নারী প্রার্থীর বয়স ছিল ২৫ থেকে ৩৯ বছরের মধ্যে। প্রায় ৬৭ শতাংশ নারী প্রার্থীই পেশাগতভাবে কর্মজীবী বা ব্যবসায়ী ছিলেন, যা প্রমাণ করে তারা স্বাবলম্বী হয়েই রাজনীতিতে এসেছেন। এবারই প্রথম একজন হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রার্থী সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ইতিহাস গড়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি নির্বাচনে নারীদের এই বিজয় অত্যন্ত ইতিবাচক। বিশেষ করে রুমিন ফারহানা ও তাহসিনা রুশদীর মতো প্রার্থীরা যে বিশাল ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন, তা প্রমাণ করে সাধারণ ভোটাররা এখন লিঙ্গভেদের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ ও সাহসিকতাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। তবে মোট ৩০০ আসনের তুলনায় ৭ জন নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যাটি এখনও নগণ্য বলে মনে করেন অনেকে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এই সাত বিজয়ী নারী সংসদ সদস্য আগামী দিনে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারেন, সেদিকেই এখন তাকিয়ে দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ।

এএন