বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী কাজল দেবগন সম্প্রতি জানালেন, সমাজ তাকে নিয়ে যে 'খারাপ মা' বা 'খারাপ স্ত্রী'র মতো মন্তব্য করে, তা আর তাকে বিচলিত করে না। বরং নিজের সন্তানদের ভালোবাসা আর পরিবারের ভেতরের বাস্তব সুখই এখন তার জীবনের মানদণ্ড।
শুভঙ্কর মিশ্রের পডকাস্ট ‘নিউজবুক’-এ কাজল বলেন, আমি খারাপ মা? হোক খারাপ! খারাপ স্ত্রী? হোক খারাপ স্ত্রী! আমি এসব নিয়ে বেশি ভাবি না। আমার সন্তানরা আমাকে ভালোবাসে, ওদের কাছে আমি ফেরেশতা।
তার এই অকপট বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ প্রশংসা করেছেন তার আত্মবিশ্বাসের, কেউ আবার মনে করছেন একজন নারী হিসেবে কাজলের এই বক্তব্য ভারতীয় সমাজের গভীরে থাকা একপ্রকার পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
কর্মজীবী নারীরা প্রায়ই সমাজের নানা রকম অমূলক বিচার, পক্ষপাত আর অবাঞ্ছিত মন্তব্যের মুখোমুখি হন। তাদের সবসময়ই ‘নিখুঁত মা’, ‘নিখুঁত স্ত্রী’ বা ‘আদর্শ নারী’ হওয়ার বোঝা বইতে হয়। কাজল সেই বাস্তবতার কথাই তুলে ধরেছেন নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে।
তিনি বলেন, মানুষ যেভাবে বিচার করে, তাতে একসময়ে নিজের ওপরই সন্দেহ জন্মাতে পারে। কিন্তু এখন আমি জানি আমি যেমন, তেমনটাই যথেষ্ট। অন্যদের ভাবনা আমার জীবন চালায় না।
কাদাবামস হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অপর্ণা রায় বলেন, কারও ওপর 'তুমি খারাপ মা', তুমি খারাপ স্ত্রী' এমন নেতিবাচক তকমা চাপিয়ে দিলে তা একজনের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
মানুষ যখন বারবার এ ধরনের কথা শোনে, তখন সে নিজের ভেতরেই এই লেবেলগুলো বিশ্বাস করতে শুরু করে। মস্তিষ্ক এগুলোকে নিজের পরিচয়ের অংশ হিসেবে ধরে নেয়। তখন তার আত্মসম্মান, আত্মবিশ্বাস, এমনকি নিজের পরিচয়ও ভেঙে যেতে থাকে,বলেন অপর্ণা রায়।
একে বলা হয় ‘ইন্টারনালাইজেশন’ বা ‘আত্মীকরণ প্রক্রিয়া’যেখানে বাইরের নেতিবাচক মতামত নিজের চিন্তায় ঢুকে পড়ে। ফলাফল হয় আত্মগ্লানি, বিষণ্নতা, উদ্বেগ, এমনকি আত্মমূল্যবোধের ক্ষয়।
অপর্ণা রায়ের মতে, বারবার' তুমি খারাপ' ধরনের কথা শুনতে শুনতে একজন নারী সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কেও অনিরাপদ হয়ে পড়তে পারেন।
তখন তিনি অতিরিক্ত ‘পিপল প্লিজার’ হয়ে ওঠেন সবাইকে খুশি রাখতে গিয়ে নিজের প্রয়োজন ও আবেগ দমন করতে থাকেন। এতে মানসিক ক্লান্তি, ক্ষোভ ও একসময় সম্পর্কের ভাঙন দেখা দেয়,' বলেন তিনি।
একজন স্ত্রী যদি মনে করেন তিনি যথেষ্ট ভালো নন, তবে তিনি সঙ্গীর কাছ থেকে দূরে সরে যেতে পারেন। একজন মা যদি নিজেকে অযোগ্য ভাবেন, তবে সন্তানদের সামনে অতিরিক্ত নরম বা অযথা কঠোর হয়ে উঠতে পারেন। উভয় অবস্থাই পরিবারে টানাপোড়েন তৈরি করে।
অপর্ণা যোগ করেন, এই অবস্থায় স্বামী বা সন্তানরাও একপ্রকার ভয় নিয়ে বাঁচে—কী বললে মায়ের মন খারাপ হবে বা রাগ হবে। ফলে পারিবারিক সম্পর্কে স্বচ্ছতা ও উষ্ণতা হারিয়ে যায়।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, 'কগনিটিভ রিফ্রেমিং 'বা চিন্তার কাঠামো বদলানোর মাধ্যমে এসব নেতিবাচক ভাবনা থেকে বের হওয়া সম্ভব। অর্থাৎ, নিজের ভেতরের কণ্ঠে প্রশ্ন করা 'আমি কি সত্যিই খারাপ মা?' বরং বলা উচিত, 'আমি মানুষ, ভুল করি, কিন্তু আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করি ভালো মা হওয়ার।'
অপর্ণা রায় বলেন, 'নিজেকে একজন গোয়েন্দার মতো ভাবুন। খুঁজে দেখুন, কখন আপনি ধৈর্য ধরেছেন, কখন সন্তানকে সান্ত্বনা দিয়েছেন—এই ঘটনাগুলিই প্রমাণ করে আপনি আসলে যত্নশীল।
তিনি আরও বলেন, আত্ম-সহমর্মিতা বা ‘সেলফ-কম্প্যাশন’ অনুশীলন মানসিক প্রশান্তি আনে। তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, সচেতনভাবে অনুভব করা: 'এ মুহূর্তটা কষ্টের। মনে রাখা: 'আমি একা নই; সবার জীবনেই ভুল হয়। নিজের প্রতি দয়া দেখানো: 'আমি আমার সেরাটা দিচ্ছি।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, নিজের চারপাশে ইতিবাচক ও সহায়ক মানুষদের রাখা জরুরি। যারা সবসময় সমালোচনা করে, তাদের থেকে দূরে থাকা উচিত।
এছাড়া ছোট ছোট সীমা নির্ধারণ করা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য কার্যকর। যেমন, অযথা সামাজিক অনুষ্ঠানে না যাওয়া বা অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্যে সাড়া না দেওয়া।
অপর্ণা রায়ের মতে, প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলর এর সহায়তা নিতে দ্বিধা করা উচিত নয়। বিশেষ করে CBT (Cognitive Behavioral Therapy) বা ACT (Acceptance and Commitment Therapy) প্রমাণিতভাবে কার্যকর পদ্ধতি, যা নেতিবাচক আত্মধারণা পরিবর্তনে সাহায্য করে।
কাজল বলেন, 'আমি জানি, বাইরে লোকজন কী বলবে, তা আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। কিন্তু আমি কেমন মা বা স্ত্রী তা আমি আর আমার পরিবারই জানি। আমার সন্তানরা আমাকে ভালোবাসে, ওদের চোখে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উপহার।
তার এই বক্তব্য কেবল একজন অভিনেত্রীর আত্মবিশ্বাসের গল্প নয় এটি হাজারো নারীরও গল্প, যারা প্রতিদিন সমাজের তকমা আর বিচারবোধের সঙ্গে লড়ছেন।
সমাজের চোখে 'পারফেক্ট নারী' বলে কিছু নেই। বরং প্রতিটি মানুষই নিজের সীমার ভেতর সেরাটা দেয়ার চেষ্টা করে।
কাজলের বক্তব্য ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ মনে করিয়ে দেয় ভুল করা মানে ব্যর্থ হওয়া নয়, নিজের প্রতি সহমর্মিতা রাখা মানে আত্মপ্রেম নয় এবং নিজের মূল্যায়ন অন্যের চোখে নয়, নিজের হৃদয়ে খুঁজে নেওয়াই প্রকৃত মুক্তি।
ইএইচ