ডায়াবেটিস এখন বাংলাদেশের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। শহর থেকে গ্রাম—সবখানে এ রোগীর সংখ্যা বাড়ছে দ্রুত। চিকিৎসকরা বলছেন, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নিয়মিত জীবনযাপন, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও প্রতিদিন অন্তত ৪০ মিনিট হাঁটা। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা সতর্ক করেছেন, নিয়ম না মানলে ডায়াবেটিস জটিল হয়ে হার্ট, কিডনি, চোখ ও স্নায়ুর নানা রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
রোগীর সংখ্যা বাড়ছে
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (বাডাস)-এর তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এ সংখ্যা প্রতি বছর ৫-৭ শতাংশ হারে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, কাজের চাপে মানসিক চাপ, পর্যাপ্ত ব্যায়ামের অভাব এবং অনিয়মিত জীবনযাপনই মূলত এই রোগ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ডাক্তারদের মতামত
বারডেম জেনারেল হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ আব্দুল করিম বলেন, ‘ডায়াবেটিসের চিকিৎসা শুধু ওষুধ বা ইনসুলিনের মাধ্যমে নয়, বরং রোগীকে তার জীবনযাপন পুরোপুরি পরিবর্তন করতে হবে। নিয়মিত সময়ে খাওয়া, পরিমিত খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত ঘুম ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. শামসুন্নাহার বলেন, ‘প্রতিদিন অন্তত ৪০ মিনিট হাঁটা, সপ্তাহে পাঁচদিন ব্যায়াম, এবং প্রতিদিন একই সময়ে খাবার গ্রহণ করা ডায়াবেটিস রোগীর জন্য বাধ্যতামূলক। অনিয়ম করলে রক্তের গ্লুকোজ ওঠানামা করে, যা দীর্ঘমেয়াদে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা কিডনির জটিলতা তৈরি করতে পারে।’
খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্ব
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সুষম খাদ্যাভ্যাস সবচেয়ে জরুরি। ডাক্তাররা বলেন –
ডা. করিম বলেন, ‘যে রোগী নিয়মিত খাবার খায়, খাবারের পর হাঁটে এবং পর্যাপ্ত ঘুমায় তার ডায়াবেটিস সহজে নিয়ন্ত্রণে থাকে।’
নিয়মিত ব্যায়াম ও হাঁটার উপকারিতা
ডাক্তারদের মতে, প্রতিদিন অন্তত ৪০ মিনিট দ্রুত হাঁটা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ওষুধের মতো কার্যকর। হাঁটার ফলে রক্তে শর্করা পুড়িয়ে শরীরের এনার্জি হিসেবে ব্যবহার হয়। এতে ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ে এবং রক্তের গ্লুকোজ স্বাভাবিক থাকে।
শরীরচর্চা বিশেষজ্ঞ ডা. আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘হাঁটা, সাঁতার, সাইক্লিং, বা হালকা জগিং ডায়াবেটিস রোগীর জন্য খুবই উপকারী। তবে হঠাৎ বেশি ব্যায়াম শুরু করা উচিত নয়। ধীরে ধীরে বাড়াতে হবে।’
সময়মতো ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নিয়মিত সময়ে ঘুমানো এবং প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা বিশ্রাম নেওয়া ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য জরুরি। রাতে দেরি করে ঘুমানো বা পর্যাপ্ত ঘুম না হলে রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে যেতে পারে।
মানসিক চাপও ডায়াবেটিসকে বাড়িয়ে দেয়। তাই মেডিটেশন, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস অনুশীলন, বই পড়া বা সঙ্গীত শোনার মাধ্যমে মানসিক চাপ কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন ডাক্তাররা।
নিয়ম না মানলে কী ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে নিয়ম না মানলে ডায়াবেটিস রোগীর শরীরে নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। যেমন –
হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। কিডনি বিকল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যেতে পারে (ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি)। পায়ের ক্ষত শুকাতে দেরি হয় এবং সংক্রমণ হতে পারে। স্নায়ুর ক্ষতি হয়ে হাত-পায়ে অসাড়তা দেখা দেয়।
সরকারের উদ্যোগ
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাচ্ছে। বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ডায়াবেটিস স্ক্রিনিং ক্যাম্প, ফ্রি মেডিকেল চেকআপ এবং সচেতনতা কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে।
উপসংহার
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নিয়মিত জীবনযাপনই হলো সবচেয়ে বড়ো ওষুধ। সঠিক সময়ে খাবার খাওয়া, প্রতিদিন অন্তত ৪০ মিনিট হাঁটা, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত ঘুম এই চারটি অভ্যাস মেনে চললেই ডায়াবেটিস সহজে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের পরামর্শ— ‘ডায়াবেটিস নিয়ে ভয় নয়, নিয়ম মেনে চলাই হলো মূল লক্ষ্য। রোগীর ইচ্ছাশক্তি ও সচেতনতা থাকলে ডায়াবেটিসে সুস্থ জীবনযাপন সম্ভব।’
জেএইচআর