নারীর শরীর প্রকৃতিগতভাবে অনন্য জীবন জন্মদানের ক্ষমতাই তাকে বিশেষ করেছে। এই জীবনচক্রে কৈশোর, যৌবন, গর্ভধারণ, মাতৃত্ব ও মেনোপজ প্রতিটি ধাপে শারীরিক ও মানসিক নানা পরিবর্তন ঘটে। এসব পরিবর্তনের সঠিক যত্ন ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয়টিই প্রসূতি ও স্ত্রীরোগবিদ্যা শাস্ত্রের মূল উদ্দেশ্য।
প্রসূতি শাস্ত্র মূলত গর্ভাবস্থা, প্রসব ও প্রসব পরবর্তী সময়ের চিকিৎসা, পর্যবেক্ষণ ও নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করার বিষয় নিয়ে কাজ করে।
অন্যদিকে, স্ত্রীরোগবিদ্যা নারীর প্রজনন অঙ্গ, হরমোন, মাসিক, বন্ধ্যত্ব, টিউমার, সংক্রমণ, এবং মেনোপজ-পরবর্তী জটিলতা নিয়ে কাজ করে।
দুটি শাখা পরস্পর সম্পর্কিত। একে অপরকে পরিপূরক করে নারীর জীবনব্যাপী স্বাস্থ্যরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গর্ভাবস্থা একাধারে আনন্দের ও ঝুঁকিপূর্ণ সময়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রতিটি গর্ভবতী মায়ের অন্তত চারবার চিকিৎসকের কাছে নিয়মিত ফলোআপ নেওয়া জরুরি।
এ সময়ের মূল করণীয়গুলো হলো, রক্তস্বল্পতা পরীক্ষা ও আয়রন-ফলিক অ্যাসিড সেবন, রক্তচাপ ও প্রস্রাব পরীক্ষার মাধ্যমে প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া পর্যবেক্ষণ, টিটেনাস টিকা গ্রহণ ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা, মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া ও পর্যাপ্ত বিশ্রাম।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মাতৃমৃত্যুর অন্যতম কারণ হলো রক্তস্বল্পতা, সংক্রমণ, প্রসব জটিলতা ও চিকিৎসার বিলম্ব। বাংলাদেশে এখনো প্রতি লাখ জীবিত জন্মে প্রায় ১৬৩ জন মা মারা যান যা এখনো উদ্বেগজনক।
অনেক নারী লজ্জা, ভয় বা সামাজিক কুসংস্কারের কারণে প্রজনন অঙ্গের অসুখ লুকিয়ে রাখেন। অথচ এগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিলে সহজেই নিরাময়যোগ্য।
সাধারণ স্ত্রীরোগসমূহের মধ্যে রয়েছে, অনিয়মিত মাসিক বা অতিরিক্ত রক্তপাত, পেলভিক ইনফেকশন ও সাদা স্রাবের সমস্যা, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম, বন্ধ্যাত্ব, গর্ভাশয় বা স্তনের টিউমার ও ক্যানসার।
বিশেষ করে সারভাইক্যাল ক্যানসার (জরায়ুমুখ ক্যানসার) বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রাণঘাতী রোগ। নিয়মিত প্যাপ স্মিয়ার টেস্ট ও এইচপিভি ভ্যাকসিন গ্রহণের মাধ্যমে এ রোগ প্রতিরোধ করা যায়।
মেয়েদের কৈশোরকালেই শুরু হয় শরীর ও হরমোনের দ্রুত পরিবর্তন। এই সময় তাদের সঠিক স্বাস্থ্য শিক্ষা না থাকলে নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দেয়।
স্কুল ও পরিবারের উচিত কিশোরীদের মাসিক, হাইজিন ও শারীরিক পরিবর্তন বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করা।
স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার, আয়রনসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ ও ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তোলা। প্রজননস্বাস্থ্য ও আত্মরক্ষা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি।
একজন শিক্ষিত ও স্বাস্থ্যসচেতন কিশোরীই পরবর্তীতে সুস্থ মা ও সচেতন সমাজ গড়ে তুলতে পারে।
প্রসূতি বা স্ত্রীরোগ চিকিৎসায় শুধু শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যও অপরিহার্য। অনেক নারী গর্ভাবস্থা বা সন্তান জন্মের পর বেবি ব্লুজ বা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনে ভোগেন।
চিকিৎসকদের মতে, গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তনের ফলে উদ্বেগ, অস্থিরতা বা কান্নাকাটি দেখা দিতে পারে। পরিবার ও স্বামীকে এ সময় সহানুভূতিশীল ভূমিকা নিতে হয়।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সহযোগিতা ও সঠিক পরামর্শে এ ধরনের অবস্থা সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
দেশে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলে ৪০টিরও বেশি প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। জেলা হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও উপজেলা পর্যায়েও মাতৃসেবা ইউনিট রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামীণ পর্যায়ে দক্ষ ধাত্রী বাড়ানো, ২৪ ঘণ্টা নিরাপদ প্রসবসেবা নিশ্চিত করা, মাতৃ ও নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট স্থাপন এবং পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির জোরদার প্রয়োগ এসব পদক্ষেপই মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের ঝুঁকি কমাতে পারে।
আজকের যুগে স্ত্রীরোগ চিকিৎসায় এসেছে আধুনিক ল্যাপারোস্কোপি, হরমোনাল থেরাপি, টেস্ট টিউব বেবি ও জিন থেরাপির মতো অগ্রগতি।
বিশেষ করে বন্ধ্যত্ব নিরসনে ইন-ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন এবং ইনট্রা-ইউটেরাইন ইনসেমিনেশন এখন অনেক নারীর কাছে আশার আলো হয়ে উঠেছে।
এছাড়া, AI-ভিত্তিক মেডিকেল ইমেজিং এখন প্রাথমিক পর্যায়েই জরায়ু, ডিম্বাশয় বা স্তনের টিউমার শনাক্তে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মীয় নির্দেশনাতেও নারীর স্বাস্থ্যরক্ষার গুরুত্ব স্পষ্টভাবে বলা আছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তার অধীনস্তদের বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে। অতএব, মায়ের সুস্থতা শুধু তার ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়; এটি পরিবার ও সমাজের সামগ্রিক দায়িত্বও বটে।
পরিবারের পুরুষ সদস্যদেরও বুঝতে হবে—প্রসূতি বা স্ত্রীরোগ চিকিৎসা কোনো লজ্জার বিষয় নয়; এটি স্বাস্থ্যসেবার স্বাভাবিক অংশ।
নিয়মিত স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া, প্যাপ স্মিয়ার টেস্ট ও স্তন পরীক্ষা বছরে অন্তত একবার করা, গর্ভাবস্থায় চারবার মেডিকেল চেকআপ, আয়রন, ফলিক অ্যাসিড ও ক্যালসিয়াম গ্রহণ, প্রসব-পরবর্তী ছয় সপ্তাহ মায়ের বিশ্রাম ও পুষ্টি নিশ্চিত করা, মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন ও পারিবারিক সহায়তা বৃদ্ধি, কৈশোর থেকেই স্বাস্থ্য শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়ানো।
নারীর স্বাস্থ্য মানেই সমাজের স্বাস্থ্য। প্রসূতি ও স্ত্রীরোগবিদ্যা শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের শাখা নয় এটি একপ্রকার মানবিক বিজ্ঞান, যা মা, শিশু ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনরক্ষার দায়িত্ব বহন করে।
আমাদের প্রত্যেকের উচিত নারীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে সচেতন থাকা, কুসংস্কার ও লজ্জার দেয়াল ভেঙে চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করা। কারণ একজন সুস্থ মা মানেই একটি সুস্থ জাতি।
ইএইচ