মানবদেহের কোষগুলো প্রতিনিয়ত জন্মায়, বেঁচে থাকে এবং মৃত্যু বরণ করে। কিন্তু যখন কোনো কোষ নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজন শুরু করে, তখনই জন্ম নেয় ক্যানসার। এই জটিল ও প্রাণঘাতী রোগের গবেষণা, নির্ণয়, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা নিয়েই চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি পূর্ণাঙ্গ শাখা হলো অনকোলজি।
অনকোলজি শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ 'Onkos' অর্থাৎ 'গাঁট বা টিউমার' থেকে। এটি এমন একটি চিকিৎসা শাখা যেখানে ক্যানসারের
কারণ, প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, এবং পুনর্বাসন বিষয়ে গবেষণা ও চিকিৎসা করা হয়। এই শাখার চিকিৎসককে বলা হয় অনকোলজিস্ট অর্থাৎ ক্যানসার বিশেষজ্ঞ।
মেডিকেল অনকোলজি: ক্যানসার চিকিৎসায় ওষুধ, কেমোথেরাপি, টার্গেট থেরাপি ও ইমিউনোথেরাপির ব্যবহার নিয়ে কাজ করে।
সার্জিকাল অনকোলজি: অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ক্যানসার আক্রান্ত টিউমার বা অঙ্গ অপসারণে ভূমিকা রাখে।
রেডিয়েশন অনকোলজি: রেডিয়েশনের সাহায্যে ক্যানসার কোষ ধ্বংস বা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে।
এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পেডিয়াট্রিক অনকোলজি (শিশু ক্যানসার), গাইনোকোলজিক অনকোলজি (নারীর প্রজনন অঙ্গের ক্যানসার) এবং নিউরো-অনকোলজি (মস্তিষ্কের টিউমার) বিশেষায়িত শাখা হিসেবে গড়ে উঠেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি মানুষ ক্যানসারে মারা যান। অর্থাৎ প্রতি ছয়জন মৃত্যুর মধ্যে একজনের কারণ ক্যানসার। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ১.৫ লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হন এবং ১ লাখের বেশি মানুষ মারা যান।
সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, স্তন ক্যানসার, ফুসফুস ক্যানসার, জরায়ুমুখ ক্যানসার, মুখ ও খাদ্যনালীর ক্যানসার, লিভার ও কোলন ক্যানসার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মৃত্যুর অন্তত ৪০% প্রতিরোধযোগ্য, যদি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা যায়।
ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য: ক্যানসারের সবচেয়ে বড় কারণ বিশেষত মুখ, ফুসফুস ও গলার ক্যানসার।
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত লবণ, চর্বি ও লাল মাংস ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
পরিবেশ দূষণ ও রেডিয়েশন: শিল্পকারখানার দূষণ, বায়ুদূষণ ও রাসায়নিক দ্রব্য ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে।
জীবনযাত্রায় অনিয়ম: ব্যায়ামের অভাব, স্থূলতা ও মানসিক চাপও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
ভাইরাস সংক্রমণ: যেমন এইচপিভি থেকে জরায়ুমুখ ক্যানসার, হেপাটাইটিস বি ও সি থেকে লিভার ক্যানসার।
লক্ষণ ও প্রাথমিক শনাক্তকরণ: সময়ই সবচেয়ে বড় চিকিৎসা
ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো উপসর্গ দেখা দেয় না। তবে কিছু সাধারণ সতর্কসংকেত হলো, অনিয়মিত ওজন কমে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী কাশি বা কণ্ঠ ভাঙা, ক্ষত বা ঘা না শুকানো, স্তনে গাঁট বা পরিবর্তন, অজানা রক্তপাত বা স্রাব, খাবার গিলতে কষ্ট বা হজম সমস্যা।
এই লক্ষণগুলো অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে ৮০% ক্যানসার নিরাময়যোগ্য।
অনকোলজি চিকিৎসায় প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।
কেমোথেরাপি: ক্যানসার কোষ ধ্বংসে ওষুধ ব্যবহার করা হয়।
রেডিয়েশন থেরাপি: উচ্চক্ষমতার রেডিয়েশনের মাধ্যমে কোষ ধ্বংস করা হয়।
ইমিউনোথেরাপি: দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা সক্রিয় করে ক্যানসার কোষের বিরুদ্ধে লড়াই করানো হয়।
টার্গেটেড থেরাপি: ক্যানসার কোষের নির্দিষ্ট জিন বা প্রোটিনকে লক্ষ্য করে চিকিৎসা করা হয়।
প্রিসিশন মেডিসিন: রোগীর জিনগত গঠন অনুযায়ী ব্যক্তিভেদে চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশেও এখন ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে এসব উন্নত থেরাপি ধীরে ধীরে চালু হচ্ছে।
নারীদের মধ্যে স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যানসার সবচেয়ে বেশি। প্রতিরোধে করণীয়, ৩০ বছর বয়সের পর প্রতি বছর ব্রেস্ট সেলফ এক্সামিনেশন ও ম্যামোগ্রাম, HPV ভ্যাকসিন গ্রহণ ও প্যাপ স্মিয়ার টেস্ট করা, বিয়ের আগে সচেতনতা ও স্বাস্থ্য শিক্ষা দেওয়া।
শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় লিউকেমিয়া (রক্তের ক্যানসার)। সময়মতো চিকিৎসা পেলে প্রায় ৮০% শিশু সম্পূর্ণ সুস্থ হয়।
দেশে বর্তমানে ৩০টিরও বেশি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে অনকোলজি বিভাগ রয়েছে। জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি) ও ঢাকা মেডিকেল কলেজে উন্নত চিকিৎসা চালু রয়েছে।
তবে চ্যালেঞ্জ এখনো অনেক, পর্যাপ্ত রেডিয়েশন মেশিনের অভাব, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের স্বল্পতা, ক্যানসার ওষুধের উচ্চমূল্য, জেলা পর্যায়ে সেবার অপ্রাপ্যতা।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ক্যানসার চিকিৎসা শুধু ওষুধ বা যন্ত্র নয়; এটি একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা রোগী, পরিবার ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
বিশ্বব্যাপী চিকিৎসকরা এখন ক্যানসারের চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক অনকোলজিতে গুরুত্ব দিচ্ছেন। অর্থাৎ, রোগ হওয়ার আগেই সচেতনতা ও জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
প্রতিরোধমূলক করণীয়, তামাক ও ধূমপান পরিহার, ফল, শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ কমানো, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্ক্রিনিং টেস্ট টিকা গ্রহণ (HPV, হেপাটাইটিস বি)।
ক্যানসার রোগীর চিকিৎসা যতটা শারীরিক, ততটাই মানসিক। চিকিৎসকের পাশাপাশি পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও সমাজের সহানুভূতিই রোগীর বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগায়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানসিক প্রশান্তি, ইতিবাচক মনোভাব ও সামাজিক সহায়তা চিকিৎসার সফলতা বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশে এখন ক্যানসার সাপোর্ট গ্রুপ ও কাউন্সেলিং সেন্টার গড়ে উঠছে, যা এই দিকটিতে আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ।
অনকোলজি আজ আর কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় নয়; এটি মানবতারও প্রতীক। কারণ, ক্যানসার শুধু একটি রোগ নয় এটি একজন মানুষ, একটি পরিবার, এবং এক জাতির মানসিক শক্তির পরীক্ষা।
প্রতিরোধ, প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও সঠিক চিকিৎসা এই তিন স্তম্ভই ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অস্ত্র। এখন সময় এসেছে কুসংস্কার নয়, জ্ঞানের আলোয় এগিয়ে যাওয়ার।
আমরা সবাই যদি নিজেদের জীবনধারায় সামান্য পরিবর্তন আনি তাহলেই হয়তো আগামী প্রজন্ম একটি ক্যানসারমুক্ত সমাজ উপহার পাবে।
ইএইচ