দেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি বাড়ছে হাইপোগ্লাইসেমিয়া অর্থাৎ রক্তে অতিরিক্ত কম সুগার হয়ে যাওয়া সংক্রান্ত জটিলতাও। অনেক সময় হঠাৎ করেই রোগীর সুগার বিপজ্জনক মাত্রায় নেমে গিয়ে অসুস্থতা দেখা দেয়, যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনলে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে জীবনহানির ঝুঁকি পর্যন্ত তৈরি হতে পারে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিস রোগীর সুগার লোবা মানুষ যা অনেক সময় নীল হয়ে যাওয়া বলে থাকে এটি আসলে শরীরের তীব্র শর্করাহীনতার সংকেত, এবং এসময় তাৎক্ষণিক সঠিক পদক্ষেপই পারে রোগীকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে।
হাইপোগ্লাইসেমিয়ার প্রাথমিক লক্ষণগুলো হঠাৎ করেই দেখা দিলেও দ্রুত চিহ্নিত করা গেলে জটিলতা এড়ানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুগার কমে গেলে সাধারণত যে উপসর্গগুলো দেখা দেয়- মাথা ঘোরা বা ভার লাগা, শরীর কাঁপা বা হাত-পা দুর্বল হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, চোখে ঝাপসা দেখা, তীব্র ক্ষুধা, অস্বাভাবিক রাগ বা অস্থিরতা, ঠোঁট বা আঙুল নীলচে হয়ে আসা (রোগীরা কথোপকথনে যাকে 'নীল হওয়া'বলে উল্লেখ করেন), চেতনা ঝাপসা হয়ে যাওয়া বা অজ্ঞান হয়ে পড়া।চিকিৎসকদের মতে, এসব উপসর্গ দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি করা উচিত নয়।
যদি রোগী কথা বলতে ও গিলতে সক্ষম থাকেন, তবে দ্রুত কিছু শর্করাযুক্ত খাবার বা পানীয় দিতে হবে। চিকিৎসা নির্দেশনা অনুযায়ী, নীচের যেকোনো একটি গ্রহণ করানো যেতে পারে যেমন- ৩–৪ চা-চামচ চিনি পানি বা গরম জলে গুলে, গ্লুকোজ গুঁড়া ১ টেবিল চামচ পানি মিশিয়ে, এক গ্লাস মিষ্টি জুস (কমলার জুস বা আঙুরের জুস), গ্লুকোজ ট্যাবলেট (১৫ গ্রাম শর্করা সমান), মধু ১ টেবিল চামচ।
১০–১৫ মিনিট অপেক্ষা করে আবার সুগার পরীক্ষা করা উচিত। যদি সুগার এখনো কম থাকে, তবে একই প্রক্রিয়া আবার করতে হবে।
চিকিৎসকেরা বলেন, শুধু চিনি খাওয়ানো নয়, সুগার বাড়ার পর রোগীকে একটি স্ন্যাকস খেতে দেওয়াও জরুরি। যেমন- বিস্কুট, রুটি, কলা বা অন্য ফল, অল্প ভাত বা খিচুড়ি, এতে সুগার আবার কমে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।
রোগী অজ্ঞান বা গিলতে অক্ষম হলে করণীয়: এক্ষেত্রে ভুল পদক্ষেপ প্রাণঘাতী হতে পারে। মনে রাখতে হবে- অজ্ঞান বা অর্ধ-অচেতন রোগীর মুখে জোর করে পানি, মধু বা চিনির পানি ঢোকানো যাবে না, মুখে কিছু ঢোকালে শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে শ্বাসরোধের ঝুঁকি থাকে, যা করতে হবে, অবিলম্বে অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন, রোগীকে পাশ ফিরিয়ে শুইয়ে দিন (রিকভারি পজিশন), হাসপাতালে নেওয়ার সময় রোগীর ডায়াবেটিস এবং নেওয়া ওষুধ সম্পর্কে পরিচিতদের জানিয়ে দিন, নিকটস্থ হাসপাতাল বা জরুরি বিভাগে দ্রুত নিয়ে যান, হাসপাতালে সাধারণত শিরায় (IV) গ্লুকোজ দেওয়া হয়, যা দ্রুত সুগার বাড়াতে সাহায্য করে।
হাইপোগ্লাইসেমিয়া সাধারণত কয়েকটি সাধারণ কারণে ঘটে থাকে- খাবার দেরি করে খাওয়া বা না খাওয়া, ইনসুলিন বা ওষুধ বেশি নেওয়া, অতিরিক্ত ব্যায়াম বা কাজকর্ম, অ্যালকোহল পান, কিডনি বা লিভারের সমস্যা, অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা ঘুমের ঘাটতি।
চিকিৎসকদের মতে, অনেক রোগীই নির্দিষ্ট রুটিন মেনে খাবার খান না এটি লো সুগারের অন্যতম প্রধান কারণ।
বিশেষজ্ঞদের মতামত: ঢাকার বিভিন্ন ডায়াবেটিস গবেষণা ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশে ডায়াবেটিস সচেতনতা বাড়লেও লো সুগারের জরুরি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অনেক রোগী এবং পরিবারের সদস্যই যথেষ্ট জানেন না।
একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, রোগী নীলচে হতে শুরু করলে অনেকে ঘাবড়ে গিয়ে ভুল উপায়ে সাহায্য করেন। এতে রোগীর আরও ক্ষতি হয়। সঠিক সময় সঠিক সিদ্ধান্তই জীবন রক্ষা করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, পরিবারের অন্য সদস্যদেরও লো সুগারের লক্ষণ ও জরুরি করণীয় সম্পর্কে প্রশিক্ষিত হওয়া দরকার।
ওষুধ বা ইনসুলিন ব্যবহারকারীদের জন্য কিছু নিয়ম অনুসরণ করলে অনেক ক্ষেত্রে লো সুগারের ঝুঁকি কমে আসে- প্রতিদিন সময়মতো খাবার খাওয়া, খুব বেশি সময় উপোস না থাকা, ব্যায়াম করার আগে ও পরে সুগার পর্যবেক্ষণ, ডাক্তার নির্দেশিত মাত্রায়ই ওষুধ বা ইনসুলিন ব্যবহার, বাইরে বের হলে গ্লুকোজ বা মিষ্টি বিস্কুট সঙ্গে রাখা, নিয়মিত সুগার মনিটরিং, গাড়ি চালানোর আগে ও দীর্ঘ ভ্রমণে সুগার চেক করা।
ডাক্তাররা জানান, দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস থাকা অনেক রোগীর শরীরে 'লো সুগার' অনুভব করার ক্ষমতা কমে যায় যাকে বলা হয় হাইপোগ্লাইসেমিয়া আনঅ্যাওয়ারনেস। এদের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক থাকা জরুরি।
ডায়াবেটিস রোগীকে ঘিরে থাকা পরিবার, বন্ধু বা সহকর্মীদেরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা উচিত যেমন- রোগীর কোন ওষুধ বা ইনসুলিন ব্যবহার করেন, সুগার কমে গেলে কোন খাবারটি দ্রুত দিতে হবে, রোগী অজ্ঞান হলে কীভাবে পাশে শুইয়ে রাখতে হবে, কোথায় নিকটস্থ হাসপাতাল আছে, জরুরি ফোন নম্বর।
অনেক দেশে পরিবারের সদস্যদের গ্লুকাগন ইনজেকশন ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যদিও দেশে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত না হলেও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এটি শুরু হলে লো সুগারে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব।
ডায়াবেটিস এখন আর শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমস্যা নয় এটি একটি জাতীয় স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। প্রতিদিনই নতুন রোগী যুক্ত হচ্ছে, এবং লো সুগারের মতো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় রোগী, পরিবার ও সমাজের সচেতনতার বিকল্প নেই। সুগার কমে গেলে দ্রুত সঠিক পদক্ষেপ নিলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিপদ কাটানো সম্ভব। তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, প্রতিটি ডায়াবেটিস রোগী ও তার পরিবার যেন লো সুগারের লক্ষণ, ঝুঁকি ও প্রাথমিক করণীয়' সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখেন।
জেএইচআর