ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি কোনো সাধারণ রোগ নয়; এটি বাংলাদেশে একটি ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, হাজারো মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন। নগর ও গ্রাম কোনো এলাকাই এই রোগের ঝুঁকির বাইরে নয়। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর একটি বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য ছিল যদি সময়মতো সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা ও ব্যক্তিগত যত্ন নিশ্চিত করা যেত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর বিস্তার শুধু মশার কারণে নয়; মানুষের অবহেলা, অযত্ন ও অসচেতন জীবনযাপন এই রোগকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।
ডেঙ্গু হলো এডিস প্রজাতির মশাবাহিত একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এই মশা সাধারণত পরিষ্কার পানিতে জন্মায় এবং দিনের বেলায় বেশি কামড়ায়। ডেঙ্গুর লক্ষণ হিসেবে হঠাৎ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ব্যথা, বমি, কখনো লালচে ফুসকুড়ি দেখা যায়। জটিল ক্ষেত্রে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে রূপ নিতে পারে, যা জীবননাশের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু নিজে থেকে ভালো হয়ে যায় এমন ধারণা মারাত্মক ভুল। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নিলে প্লাটিলেট কমে যাওয়া, রক্তক্ষরণ, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থতার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ চিহ্নিত করেছেন, প্রথমত, নিজেদের অসচেতনতা ও অযত্ন। বাসার ছাদে, ফুলের টবে, পরিত্যক্ত টায়ারে, ফ্রিজের ট্রেতে, পানির ড্রামে জমে থাকা পরিষ্কার পানিই ডেঙ্গু মশার প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র। অথচ এগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা হলে ডেঙ্গুর ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
দ্বিতীয়ত, শহরকেন্দ্রিক জীবনযাপনের বিশৃঙ্খলা। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুরবস্থা ও নির্মাণাধীন ভবনের আশপাশে জমে থাকা পানি ডেঙ্গুর বিস্তারকে ত্বরান্বিত করছে।
তৃতীয়ত, দেরিতে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা। অনেকেই জ্বরকে সাধারণ ভাইরাল ভেবে অবহেলা করেন। ফলে রোগ জটিল পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যার সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক রোগীকে একাধিক হাসপাতালে ঘুরতে হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, সময়মতো হাসপাতালে ভর্তি না হওয়া এবং নিজে নিজে ওষুধ সেবন করাও মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু শুধু একজন ব্যক্তির রোগ নয় এটি একটি কমিউনিটি সমস্যা। একজনের অসচেতনতা পুরো এলাকাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মশার বংশবিস্তার রোধ। এজন্য ব্যক্তি পর্যায়ে কিছু বিষয় কঠোরভাবে মেনে চলা জরুরি-
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ওয়ার্ডভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, সামাজিক সচেতনতা সভা, মসজিদ-মন্দিরে স্বাস্থ্যবিষয়ক বার্তা প্রচার এসব উদ্যোগ ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু ব্যক্তি সচেতনতা যথেষ্ট নয়; রাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকারের শক্ত ভূমিকা অপরিহার্য। নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম, ড্রেন পরিষ্কার, নির্মাণস্থল তদারকি এবং জরিমানার মতো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মশক নিধন কার্যক্রম যেন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং কার্যকর ও নিয়মিতভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
ডেঙ্গু নিয়ে সমাজে এখনও অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকে মনে করেন, শুধু নোংরা পানিতেই মশা জন্মায় যা সম্পূর্ণ ভুল। আবার অনেকে প্লাটিলেট বাড়ানোর নামে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বা ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর নির্ভর করেন, যা বিপজ্জনক।
চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুর কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ নেই; সঠিক চিকিৎসা মানে উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রতিবেদন, তথ্যভিত্তিক আলোচনা ও ভুল তথ্য প্রতিরোধে গণমাধ্যম অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে- নিজের ঘর, আশপাশ ও কর্মস্থল পরিষ্কার রাখা এবং অন্যকেও সচেতন করা।
বেপরোয়া ডেঙ্গু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে অসচেতনতা ও অযত্নের মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে। ডেঙ্গু কোনো অদৃশ্য শত্রু নয়; এটি আমাদের চারপাশেই জন্মায়, আমাদের অবহেলার সুযোগ নিয়েই ছড়িয়ে পড়ে।
আজ যদি আমরা নিজেদের শরীরের প্রতি যত্নশীল হই, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখি এবং সময়মতো চিকিৎসা নেই তাহলে বহু প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই কোনো একক প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব।
ডেঙ্গু থামাতে হলে এখনই কঠোর সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগের বিকল্প নেই। নইলে এই নীরব ঘাতক আরও প্রাণ কেড়ে নেবে আর আমরা শুধু আফসোস করব, যদি তখন খুব দেরি হয়ে যায়।
জেএইচআর