বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। পড়াশোনা, অফিসের কাজ, সংবাদ পাঠ, সামাজিক যোগাযোগ কিংবা বিনোদন, সব ক্ষেত্রেই মোবাইলের ব্যবহার বেড়েই চলেছে। তবে দীর্ঘ সময় একটানা মোবাইল ব্যবহারের ফলে অনেকেই মাথাব্যথা, চোখে চাপ, ঘাড় ও কাঁধে ব্যথা, মাথা ঝিমুনি ও মানসিক ক্লান্তির মতো সমস্যায় ভুগছেন। চিকিৎসকদের মতে, সঠিক অভ্যাস ও স্বাস্থ্য নির্দেশনা অনুসরণ করলে মোবাইলজনিত মাথাব্যথা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
মোবাইল ব্যবহারে মাথাব্যথার কারণ
দীর্ঘ সময় মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের পেশি অতিরিক্ত চাপে পড়ে। একই সঙ্গে ঘাড় নিচু করে মোবাইল দেখার কারণে ঘাড় ও মাথার স্নায়ুতে টান সৃষ্টি হয়। স্ক্রিনের নীল আলো মস্তিষ্ককে অতিরিক্ত উত্তেজিত করে, যার ফলেও মাথাব্যথা দেখা দিতে পারে। এছাড়া পর্যাপ্ত পানি না পান করা, অনিয়মিত ঘুম ও মানসিক চাপ এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
স্ক্রিন ব্যবহারে বিরতি নেওয়া: একটানা দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার না করে প্রতি ৩০-৪০ মিনিট পরপর ৫ মিনিট বিরতি নেওয়া উচিত। বিরতির সময় চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নেওয়া বা দূরের কোনো সবুজ বস্তুর দিকে তাকালে চোখ ও মাথার ওপর চাপ কমে।
মোবাইল ব্যবহারের সঠিক ভঙ্গি: মোবাইল ব্যবহার করার সময় ঘাড় বেশি ঝুঁকিয়ে না রেখে চোখের সমান্তরালে ফোন ধরে রাখা ভালো। সোজা হয়ে বসে মোবাইল ব্যবহার করলে ঘাড় ও মাথার স্নায়ুর ওপর চাপ কম পড়ে, ফলে মাথাব্যথার ঝুঁকি হ্রাস পায়।
চোখের যত্ন ও ব্যায়াম: চোখের ক্লান্তি থেকে মাথাব্যথা সৃষ্টি হতে পারে। তাই নিয়মিত চোখ পিটপিট করা, চোখ ঘোরানো এবং কাছের ও দূরের বস্তু পর্যায়ক্রমে দেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। দিনে কয়েকবার চোখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিলে চোখ ও মাথা উভয়ই আরাম পায়।
স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা ও নীল আলো নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত উজ্জ্বল স্ক্রিন চোখ ও মস্তিষ্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। পরিবেশ অনুযায়ী স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা কমিয়ে নেওয়া উচিত। রাতে মোবাইল ব্যবহারের সময় ‘নাইট মোড’ বা ‘ব্লু লাইট ফিল্টার’ চালু করলে মাথাব্যথার প্রবণতা কমে।
পর্যাপ্ত পানি পান: শরীরে পানিশূন্যতা হলে মাথাব্যথা হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারের সময় অনেকেই পানি পান করতে ভুলে যান। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করলে শরীর হাইড্রেটেড থাকে এবং মাথাব্যথা কম হয়।
ঘুমের নিয়ম মানা: রাতে ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার করলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে এবং সকালে মাথাব্যথা অনুভূত হয়। ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল ব্যবহার বন্ধ রাখা উচিত। প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা পর্যাপ্ত ঘুম মাথাব্যথা প্রতিরোধে সহায়ক।
মানসিক চাপ কমানো: অতিরিক্ত তথ্য গ্রহণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব মানসিক চাপ বাড়ায়, যা মাথাব্যথার অন্যতম কারণ। তাই নির্দিষ্ট সময়ের বেশি সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার না করা এবং প্রয়োজনে ডিজিটাল বিরতি নেওয়া জরুরি।
হালকা ব্যায়াম ও স্ট্রেচিং: দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারের ফলে ঘাড় ও কাঁধ শক্ত হয়ে যায়। দিনে অন্তত ১০-১৫ মিনিট হালকা ব্যায়াম, ঘাড় ও কাঁধের স্ট্রেচিং করলে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে এবং মাথাব্যথা উপশম হয়।
প্রাকৃতিক উপায়ে আরাম: মাথাব্যথা হলে কপালে বা ঘাড়ে ঠান্ডা কাপড় রাখা, গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া কিংবা কিছুক্ষণ নীরব পরিবেশে বিশ্রাম নেওয়া উপকারী। এসব প্রাকৃতিক উপায় অনেক সময় ওষুধ ছাড়াই মাথাব্যথা কমাতে সাহায্য করে।
উল্লেখ্য, মোবাইল ফোন আধুনিক জীবনের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হলেও এর অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারে মাথাব্যথা একটি সাধারণ কিন্তু উপেক্ষণীয় নয় এমন সমস্যা। সচেতন ব্যবহার, সঠিক ভঙ্গি, নিয়মিত বিরতি, পর্যাপ্ত পানি ও ঘুম, এই স্বাস্থ্য নির্দেশনাগুলো মেনে চললে মোবাইলজনিত মাথাব্যথা সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
সুস্থ জীবনের জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার হোক প্রয়োজনের সীমার মধ্যে, এই সচেতনতাই হতে পারে মাথাব্যথা থেকে মুক্তির সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
ইএইচ