দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় হ্রাস এবং জীবন রক্ষাকারী ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এখন থেকে তালিকায় থাকা ২৯৫টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম সরাসরি সরকার নির্ধারণ করে দেবে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানান প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সাইদুর রহমান।
সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক ডা. সাইদুর রহমান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান যে, ওষুধের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি রোধে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
তিনি বলেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য সরকার নির্ধারণ করবে। এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের মানুষের ওষুধ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অনেক বড় প্রভাব ফেলবে। এখন থেকে সরকার নির্ধারিত দামেই বাজারে ওষুধ বিক্রি করতে হবে। এই সিদ্ধান্তটি কেবল কাগুজে কোনো ঘোষণা নয়, বরং আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই দেশজুড়ে বাস্তবায়ন করা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
এর ফলে সাধারণ মানুষ ন্যায্যমূল্যে মানসম্মত ওষুধ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ওষুধের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে সরকার কিছু সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে।
ডা. সাইদুর রহমান জানান, বিদেশি ওষুধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবিত মূল্য সরাসরি গ্রহণ না করে ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি যাচাই করা হবে। এ ছাড়া ওষুধের প্যাটেন্ট বা স্বত্বাধিকারের ওপর ভিত্তি করে 'স্বত্বাধীন' এবং 'স্বত্বহীন' ওষুধের জন্য আলাদা আলাদা মূল্যের তালিকা বা শ্রেণি তৈরি করা হবে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো আমদানিকৃত এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত উভয় ধরনের ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা।
ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণের এই প্রক্রিয়াটি একটি সুসংগঠিত কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী জানান, ইতিপূর্বেই একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। এই টাস্কফোর্স ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, বিপণনকারী সংস্থা এবং ওষুধের সাথে জড়িত সব অংশীজনের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা সম্পন্ন করেছে। এই টাস্কফোর্স বর্তমানে ‘ওষুধ মূল্য কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে কাজ করবে।
অধ্যাপক ডা. সাইদুর রহমান আরও যোগ করেন, পর্যায়ক্রমে এটি একটি স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ হিসেবে পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে। এর ফলে ওষুধ প্রাপ্তিতে বাজারে যে কৃত্রিম সংকট বা মূল্যের অরাজকতা ছিল, সেই বাধাগুলো চিরতরে কেটে যাবে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ওষুধের বাজারে দাম নির্ধারণ নিয়ে অস্থিরতা বিরাজ করছিল। বিশেষ করে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘমেয়াদী রোগের ওষুধের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় প্রান্তিক মানুষের নাভিশ্বাস উঠছিল। ২৯৫টি ওষুধের এই তালিকায় অ্যান্টিবায়োটিক, ইনসুলিন এবং ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধের মতো গুরুত্বপূর্ণ ওষুধগুলো স্থান পাওয়ায় এটি জনস্বাস্থ্যে বিশাল ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সংবাদ সম্মেলনে কেবল অভ্যন্তরীণ বাজারের দাম নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি ওষুধের সম্প্রসারণ নিয়েও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সম্প্রতি ব্রাজিলের মতো বড় বাজারগুলোতে বাংলাদেশের কৃষি ও ওষুধ পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সরকারি তদারকি ও আন্তর্জাতিক মানের মূল্য কাঠামো বিদেশে বাংলাদেশি ওষুধের সুনাম বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।
অধ্যাপক ডা. সাইদুর রহমানের এই ঘোষণা মূলত বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যখাত সংস্কারের একটি বড় অংশ। ওষুধের দাম নির্ধারণে স্বচ্ছতা এলে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে চিকিৎসা বাবদ ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।
তবে বাজার পর্যবেক্ষণ ও মাঠ পর্যায়ে তদারকি না থাকলে এই মহৎ উদ্যোগ হোঁচট খেতে পারে। তাই ওষুধ মূল্য কর্তৃপক্ষের কার্যকারিতা ও ফার্মেসিগুলোতে সরকার নির্ধারিত মূল্যের তালিকা প্রদর্শন নিশ্চিত করাই হবে এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
ইএইচ