মানবদেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সক্রিয় অঙ্গ হলো হৃৎপিণ্ড। জন্মের আগে থেকে শুরু করে মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এটি নিরবচ্ছিন্নভাবে রক্ত পাম্প করে শরীরের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন ও পুষ্টি পৌঁছে দেয়। এই অত্যাবশ্যকীয় অঙ্গ এবং এর সাথে যুক্ত রক্তনালিগুলোর গঠন, কার্যাবলি, রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা নিয়ে বিজ্ঞানের যে শাখা কাজ করে, তাকেই বলা হয় কার্ডিয়াক সায়েন্স বা হৃদবিজ্ঞান।
বর্তমান বিশ্বে অসংক্রামক ব্যাধিগুলোর মধ্যে হৃদরোগ বা কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
কার্ডিয়াক সায়েন্স কেবল একটি একক বিষয় নয়, এটি কয়েকটি বিশেষায়িত ক্ষেত্রের সমন্বয়। যেমন কার্ডিওলোজি, যেখানে ওষুধের মাধ্যমে হৃদরোগের চিকিৎসা ও প্রতিরোধ করা হয়। কার্ডিওথোরাসিক সার্জারি যা হৃৎপিণ্ড বা ফুসভুসের জটিল সমস্যা সমাধানে অস্ত্রোপচার নিয়ে কাজ করে।
ইলেক্ট্রোফিজিওলজি হৃৎপিণ্ডের বৈদ্যুতিক স্পন্দন ও ছন্দের গোলযোগ নিয়ে গবেষণা করে এবং পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলোজি শিশুদের জন্মগত হৃদরোগের চিকিৎসা প্রদান করে।
হৃদবিজ্ঞানে অসংখ্য রোগ নিয়ে গবেষণা ও চিকিৎসা করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো করিনারি আর্টারি ডিজিজ। এটি সবচেয়ে সাধারণ হৃদরোগ। হৃৎপিণ্ডের নিজস্ব রক্তনালিতে চর্বি বা প্লাক জমে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে এই সমস্যা হয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি হার্ট অ্যাটাক।
এছাড়া হার্ট ফেইলর হয় যখন হৃৎপিণ্ড শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত রক্ত পাম্প করতে পারে না। এটি দীর্ঘমেয়াদী উচ্চ রক্তচাপ বা পূর্ববর্তী হার্ট অ্যাটাকের কারণে হতে পারে।
হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন যদি খুব দ্রুত, খুব ধীর বা অনিয়মিত হয় তবে তাকে অ্যারিথমিয়া বা ছন্দের ব্যাঘাত বলে। এটি স্ট্রোক বা আকস্মিক মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। ভালভুলার হার্ট ডিজিজ হলো হৃৎপিণ্ডের ভেতরের চারটি ভালভের সমস্যা যা রক্ত প্রবাহের দিক নিয়ন্ত্রণ করে। এই ভালভগুলো যদি সরু হয়ে যায় বা লিক করে তবে রক্ত সঞ্চালনে বিঘ্ন ঘটে। অনেক শিশু জন্মের সময় হৃৎপিণ্ডে ছিদ্র বা অস্বাভাবিক গঠন নিয়ে জন্মায় যাকে কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ বা জন্মগত ত্রুটি বলা হয়। আধুনিক হৃদবিজ্ঞানের কল্যাণে এখন জন্মের পরপরই এই জটিল অস্ত্রোপচার সম্ভব।
কার্ডিয়াক সায়েন্স গত কয়েক দশকে অভাবনীয় উন্নতি করেছে। ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলোজির এনজিওগ্রামের মাধ্যমে ব্লকেজ শনাক্ত করা এবং স্টেন্টিং বা রিং পরানোর মাধ্যমে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করা এখন নিয়মিত প্রক্রিয়া। মিনিমালি ইনভেসিভ সার্জারি বা ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে রোবটিক হাত বা ল্যাপারোস্কোপিক যন্ত্র ব্যবহার করে বাইপাস সার্জারি করা হচ্ছে, যার ফলে রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।
হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম পেসমেকার বা স্বয়ংক্রিয় ডিফিব্রিলেটর স্থাপন করা হচ্ছে। শেষ পর্যায়ের হার্ট ফেইলর রোগীদের জন্য অঙ্গ প্রতিস্থাপন বা যান্ত্রিক পাম্প স্থাপন করা হচ্ছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের এত উন্নতির পরেও কার্ডিয়াক সায়েন্স বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। ফাস্ট ফুড আসক্তি, কায়িক শ্রমের অভাব এবং অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হৃদরোগের হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
কার্ডিয়াক সার্জারি বা পেসমেকার স্থাপনের খরচ অনেক বেশি হওয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিশাল সংখ্যক মানুষের পক্ষে এই ব্যয়ভার বহন করা অসম্ভব। ফলে চিকিৎসার অভাবে অনেক অকাল মৃত্যু ঘটছে।
হৃদরোগের অনেক লক্ষণ যেমন গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা মনে করা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না। গোল্ডেন আওয়ার বা হার্ট অ্যাটাকের প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে না পৌঁছানোর ফলে হার্টের পেশির অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়।
এছাড়া জীবাণুগুলো প্রচলিত ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলায় অস্ত্রোপচারের পর ইনফেকশন নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম।
কার্ডিয়াক সায়েন্স আমাদের শেখায় যে চিকিৎসা অপেক্ষা প্রতিরোধই উত্তম। হৃদরোগ থেকে দূরে থাকতে সুষম খাদ্য গ্রহণ, অতিরিক্ত লবণ, চিনি এবং ট্রান্স ফ্যাট বর্জন করা জরুরি। দিনে অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা শারীরিক পরিশ্রম এবং হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ ধূমপান বর্জন করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন।
কার্ডিয়াক সায়েন্স আজ কেবল রোগ নিরাময়ের বিজ্ঞান নয়, এটি মানুষের আয়ু বাড়ানোর এক শক্তিশালী মাধ্যম। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের ফলে এখন অনেক আগে থেকেই হার্ট অ্যাটাকের পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।
তবে কেবল প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে সুস্থ জীবনধারা মেনে চলাই হবে দীর্ঘায়ু লাভের চাবিকাঠি। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চিকিৎসার ব্যয় কমানো এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারলে কার্ডিয়াক সায়েন্সের সুফল প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো সম্ভব।
ইএইচ