দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব, ১৯ দিনে প্রাণ হারাল ৯৪ শিশু

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: এপ্রিল ৪, ২০২৬, ০২:০৯ পিএম

বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে এক ভয়াবহ উদ্বেগ তৈরি করেছে ঘাতক ব্যাধি হাম। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ দিনে দেশজুড়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৯৪ জন শিশুর। এই পরিসংখ্যান কেবল হাসপাতালের রেকর্ডে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে, যা বাস্তব পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রান্তিক জেলাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে এই সংক্রমণ।

গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৪টি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে, যা স্বাস্থ্য বিভাগ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিন ও মাঠ পর্যায়ের তথ্যে দেখা গেছে, গত একদিনে মারা যাওয়া ৪টি শিশুর মধ্যে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ২ জন করে শিশু রয়েছে। পর্যটন নগরী কক্সবাজার এবং বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে সংক্রমণের হার গত কয়েকদিন ধরেই ঊর্ধ্বমুখী।

এক নজরে বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত ১৯ দিনে মোট মৃত্যু হয়েছে ৯৪ জনের। গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হয়েছে ৪ জনের যার মধ্যে চট্টগ্রাম ২ জন এবং কক্সবাজার ২ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকাসহ ৮ বিভাগে ৯৪৭ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ভর্তি হওয়া শিশুদের মধ্য থেকে সংগৃহীত নমুনার মধ্যে ল্যাব নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে ৪২ জনের শরীরে হামের ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায়। শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের প্রাদুর্ভাবের পেছনে প্রধান কারণ হলো নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা। বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, অনেক শিশু জন্মের পর নির্দিষ্ট সময়ে হামের টিকা বা এমআর ভ্যাকসিন পায়নি। ফলে তাদের শরীরে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠেনি।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হাম নিজে যতটা না ভয়ানক, তার চেয়ে বেশি ভয়ানক এর পরবর্তী জটিলতা। হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া এবং মস্তিষ্কের প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে, যা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ভ্যাকসিনের ডোজ পূর্ণ না করায় শিশুদের শরীরে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি যা একটি বড় ইমিউনিটি গ্যাপ তৈরি করেছে। সাধারণত টিকা দেওয়ার ৩ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে শরীরে প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় হয়, কিন্তু প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর টিকা দিলেও সেই প্রতিরোধ গড়ে উঠতে সময় লাগে যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।

হামের এই ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ ও মৃত্যুহার নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার গত ২৯ মার্চ থেকে দেশজুড়ে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। এবারের কর্মসূচির লক্ষ্য হলো ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের ভ্যাকসিনের আওতায় আনা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরেও এই অতিরিক্ত ডোজ শিশুদের জন্য সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। 

তবে মাঠ পর্যায়ে অনেক অভিভাবক এখনও টিকা কেন্দ্রের তথ্য বা গুরুত্ব সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন নন, ফলে সংক্রমণের গতি রোধ করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, যে কোনো শিশুর শরীরে জ্বর ও লালচে দানা দেখা দিলেই দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়া এবং বিচ্ছিন্ন রাখা জরুরি।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা খবরে দেখা গেছে, হাসপাতালগুলোর শিশু ওয়ার্ড এখন হামের উপসর্গে আক্রান্ত রোগীদের ভিড়ে কানায় কানায় পূর্ণ। রাজধানীর মহাখালী ও মিটফোর্ডসহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে তিল ধারণের জায়গা নেই। গ্রামগঞ্জ থেকে আসা শিশুদের অবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই সংকটাপন্ন। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায় জনঘনত্ব বেশি হওয়ায় সেখানে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেখানে ২ জন শিশুর মৃত্যুর খবর আসার পর স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক প্রচারণা বাড়ানো হয়েছে।

শিশু विशेषज्ञों মতে, হাম প্রতিরোধে টিকার কোনো বিকল্প নেই। ৯ মাস বয়স পূর্ণ হলে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া বাধ্যতামূলক। যারা এই সময়ে টিকা দিতে পারেননি, তাদের জন্য বর্তমানের বিশেষ ক্যাম্পেইনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হামের সাধারণ লক্ষণগুলো খেয়াল রাখা জরুরি যার মধ্যে রয়েছে তীব্র জ্বর ও সাথে কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া ও পানি পড়া, শরীরে লালচে র‍্যাশ বা দানা ওঠা যা সাধারণত মুখমণ্ডল থেকে শুরু হয়ে শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং মুখের ভেতরে ছোট সাদাটে দাগ বা কপ্লিক স্পট। যদি কোনো শিশুর মধ্যে এসব লক্ষণ দেখা দেয়, তবে তাকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখতে হবে এবং প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার ও ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবার নিশ্চিত করতে হবে।

১৯ দিনে ৯৪ জন শিশুর প্রাণহানি কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। হামের মতো একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে এত বিপুল সংখ্যক শিশুর মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকারের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি সফল করতে জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক এবং ধর্মীয় নেতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। 

সঠিক সময়ে টিকা এবং সচেতনতাই পারে আমাদের শিশুদের এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা করতে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিভাগকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। লক্ষ্য একটাই, একটি শিশুও যেন আর হামের প্রকোপে অকালে ঝরে না যায়।

জেএইচআর