হান্তাভাইরাস ও ইবোলা পরিস্থিতি নিয়ে ডব্লিউএইচও-এর বিশেষ আপডেট

আমার সংবাদ ডেস্ক প্রকাশিত: মে ১৮, ২০২৬, ০৬:৩৭ পিএম

জেনেভা ও কিনশাসা, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআর কঙ্গো) নতুন করে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা প্রাদুর্ভাবকে একটি আন্তর্জাতিক উদ্বেগের জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এই ঘোষণার পর বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগ এবং এর পাশাপাশি একটি ক্রুজ শিপে হান্তাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়ে এক বিশেষ লাইভ ব্রিফিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ আপডেট দিতে যাচ্ছে সংস্থাটি। আফ্রিকা মহাদেশের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশে পরিস্থিতি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। সেখানে ইতিমধ্যে ৩৯০ জনেরও বেশি মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে এবং অন্তত ১০০ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

এর আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছিল যে, এই প্রাদুর্ভাবটি এখনো প্যানডেমিক বা বৈশ্বিক মহামারীর সমস্ত মানদণ্ড পূরণ করেনি। তবে সংস্থাটি একই সাথে অত্যন্ত কঠোর সতর্কবার্তা জারি করে বলেছে, বর্তমানে মাঠপর্যায়ে যে পরিমাণ আক্রান্তের সংখ্যা শনাক্ত করা গেছে, প্রকৃত চিত্র তার চেয়ে অনেক বেশি বড় এবং ভয়াবহ হতে পারে। ইতুরি প্রদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং সেখানে চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার কারণে স্বাস্থ্যকর্মীরা সব প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছাতে পারছেন না। ফলে বহু আক্রান্ত ব্যক্তি হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গভীরভাবে চিন্তিত করে তুলেছে।

ডিআর কঙ্গোতে এবারের ইবোলা প্রাদুর্ভাবের পেছনে রয়েছে ভাইরাসের একটি বিশেষ স্ট্রেন, যা বুন্দিবুজিও ভাইরাস নামে পরিচিত। ইবোলার অন্যান্য রূপের তুলনায় এই স্ট্রেনটি অত্যন্ত জটিল এবং বিপজ্জনক। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, বুন্দিবুজিও ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে অনুমোদিত কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ বা প্রতিষেধক টিকা নেই। এর আগে ইবোলার জায়ার স্ট্রেনের জন্য সফলভাবে টিকা ব্যবহার করা গেলেও, এই নতুন স্ট্রেনের ক্ষেত্রে তা কার্যকর নয়। ফলে আক্রান্ত রোগীদের কেবল লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, যা মৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আজকের নির্ধারিত ভাষণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. তেদরোস আধানোম গেব্রেয়ুসাস কেবল ইবোলা নয়, বরং একটি বিলাসবহুল ক্রুজ শিপে আকস্মিক হান্তাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নিয়েও কথা বলবেন বলে আশা করা হচ্ছে। হান্তাভাইরাস সাধারণত ইঁদুর বা রডেন্ট জাতীয় প্রাণীর মলমূত্র, লালা বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ছড়ায়। একটি বদ্ধ ক্রুজ শিপের ভেতরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক পর্যটন এবং নৌ-নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে। ড. তেদরোস এই জাহাজের বর্তমান পরিস্থিতি, কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা এবং যাত্রীদের সুরক্ষায় গৃহীত পদক্ষেপের সর্বশেষ বিবরণ তুলে ধরবেন।

আফ্রিকা মহাদেশের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ডিআর কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশটি দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতা এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত। এই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ইবোলা নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। উপদ্রুত এলাকায় গিয়ে সাধারণ মানুষের স্ক্রিনিং করা বা আক্রান্তদের আইসোলেশনে নিয়ে আসা স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য জীবননাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় জনগণ বিদেশি বা সরকারি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বিশ্বাস করতে পারছেন না, যা ভুল বোঝাবুঝি এবং সহিংসতার জন্ম দিচ্ছে। কঙ্গোর এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। ঘন জঙ্গল এবং অনুন্নত রাস্তার কারণে প্রত্যন্ত গ্রামে জরুরি চিকিৎসা সামগ্রী বা ল্যাবরেটরি কিট পাঠানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে ল্যাব টেস্টের রিপোর্ট আসতে দেরি হচ্ছে এবং ততক্ষণে ভাইরাসের সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যখন কোনো রোগকে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করে, তখন এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু উদ্দেশ্য থাকে। এই ঘোষণার ফলে বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন ধনী দেশ দ্রুত জরুরি তহবিল গঠনে এগিয়ে আসে। কঙ্গোর মতো অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশের পক্ষে একা এই ব্যয়বহুল মহামারী মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। বুন্দিবুজিও ভাইরাসের যেহেতু কোনো টিকা নেই, তাই এই ঘোষণার পর বিশ্বের বড় বড় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি এবং গবেষণাগারগুলো দ্রুত এর প্রতিষেধক আবিষ্কারের জন্য ক্লিনিকাল ট্রায়াল শুরু করার তাগিদ পাবে। কঙ্গোর প্রতিবেশী দেশসমূহ, যেমন উগান্ডা, রুয়ান্ডা এবং দক্ষিণ সুদানকে তাদের সীমান্ত এলাকায় কঠোর নজরদারি এবং স্ক্রিনিং ব্যবস্থা জোরদার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে ভাইরাসটি আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশে ছড়াতে না পারে।

আফ্রিকা সিডিসি এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যৌথভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি অবিলম্বে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি এখনই এই বুন্দিবুজিও ভাইরাসের বিস্তার ইতুরি প্রদেশের মধ্যেই আটকে দেওয়া না যায়, তবে এটি আফ্রিকার অন্যান্য অঞ্চলে এবং পরবর্তীতে বৈশ্বিক স্তরে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আজকের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই লাইভ ব্রিফিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে গোটা বিশ্বের স্বাস্থ্য খাত। হান্তাভাইরাসের আন্তর্জাতিক বিস্তার রোধ এবং কঙ্গোর ইবোলা পরিস্থিতি সামাল দিতে সংস্থাটি কী ধরনের নতুন গাইডলাইন বা অ্যাকশন প্ল্যান ঘোষণা করে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।

জেএইচআর