অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহর আজীবন এমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট আলোচনার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি, এই সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নেওয়া হয়নি; বরং আইনানুগ প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, আর্থিক জবাবদিহিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
শনিবার (২৭ জুন) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বিএমইউ জানায়, সংশ্লিষ্ট নিয়োগে প্রক্রিয়াগত, প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়মের একাধিক বিষয় পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। এসব বিবেচনায় বর্তমান সিন্ডিকেট আজীবন এমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে দেওয়া নিয়োগকে বিধিবহির্ভূত ঘোষণা করে বাতিল করেছে। একই সঙ্গে ওই নিয়োগের ভিত্তিতে নেওয়া বেতন-ভাতা প্রচলিত আইন অনুযায়ী ফেরত চাওয়া হয়েছে।
এর আগে গত মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মো. মোস্তফা কামালের সই করা এক অফিস আদেশে ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহর আজীবন এমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ বাতিল করা হয় এবং ২০২৪ সালের ২০ জুন থেকে এ পদে পাওয়া বেতন-ভাতা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার পর আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নিয়োগটি ঘিরে একাধিক প্রক্রিয়াগত, প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রশ্ন রয়েছে। এসব কারণেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ৬৬তম একাডেমিক কাউন্সিলের সুপারিশ এবং ৮৫তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহকে তিন বছরের জন্য এমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সে সময় মাসিক ৩০ হাজার টাকা সম্মানী, চিকিৎসা সুবিধা এবং সীমিত প্রশাসনিক সুবিধা নির্ধারণ করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষ্য, ওই নিয়োগ বিধি অনুসারেই হয়েছিল এবং এ নিয়ে কোনো আপত্তি ছিল না।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় জানায়, ওই মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় ছয় মাস আগে ২০২৪ সালের ২০ জুন অনুষ্ঠিত ৯২তম সিন্ডিকেট সভায় এমেরিটাস অধ্যাপক অধ্যাদেশ সংশোধন করে আজীবন নিয়োগের বিধান যুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে আর্থিক ও প্রশাসনিক সুবিধায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। সংশোধিত বিধান অনুযায়ী, অধ্যাপক আব্দুল্লাহকে অবসরের সময়ের অধ্যাপকের সমপরিমাণ মাসিক বেতন, আজীবন চিকিৎসা সুবিধা, স্টাফসহ অফিস এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
বিএমইউর দাবি, বাজেট অধিবেশনের মূল এজেন্ডার বাইরে এ ধরনের প্রস্তাব উত্থাপন ছিল নজিরবিহীন এবং আইনসম্মত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এ খাতে তিনি এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ টাকার বেশি অর্থ গ্রহণ করেছেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভাগীয় চেয়ারম্যানের সুপারিশ, ডিনের মাধ্যমে উপাচার্যের কাছে প্রস্তাব পাঠানো, মূল্যায়ন কমিটি গঠন এবং সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহর ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কেবল একজন সদস্যের প্রস্তাবের ভিত্তিতে তাকে আজীবন এমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়োগের যোগ্যতা হিসেবে ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক’ পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছিল। পাশাপাশি গত প্রায় দুই বছরে তিনি নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত হননি, শিক্ষাদান করেননি কিংবা গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে প্রশাসনকে অবহিত করেননি। তবুও ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে নিয়মিত বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।
বিএমইউ আরও জানায়, দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এমেরিটাস অধ্যাপক পদ থাকলেও আজীবন পূর্ণকালীন অধ্যাপকের সর্বোচ্চ বেতনের সমপরিমাণ পারিশ্রমিক ও এত বিস্তৃত প্রশাসনিক সুবিধা দেওয়ার নজির পাওয়া যায়নি। ফলে এ সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় সৃষ্টি করেছে।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের সংশোধনের মাধ্যমে সম্মানসূচক পদ কার্যত বেতনসদৃশ আর্থিক সুবিধাসংবলিত পদে পরিণত হয়। অথচ এ ধরনের আর্থিক পরিবর্তনের আগে অর্থ কমিটির সুপারিশ বা আর্থিক বিশ্লেষণের কোনো তথ্য নথিতে পাওয়া যায়নি। এতে আর্থিক সুশাসনের প্রশ্নও তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মতে, অধ্যাদেশ সংশোধনের পর একই সভায় তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধিত বিধানের সুবিধা প্রয়োগ করা প্রশাসনিক ও আইনগতভাবে বিতর্কিত এবং এতে অনিয়মের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বর্তমান সিন্ডিকেট ২০২৬ সালের ১৩ জুন অনুষ্ঠিত সভায় সব নথি ও তথ্য পর্যালোচনা করে ২০২৪ সালের ২৪ জুনের আজীবন এমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগকে বিধিবহির্ভূত হিসেবে বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়।
বিএমইউ জানায়, প্রচলিত বিধি অনুযায়ী কোনো নিয়োগ পরবর্তীতে প্রক্রিয়াগত বা আইনগত ত্রুটির কারণে বাতিল হলে, সেই নিয়োগের ভিত্তিতে দেওয়া আর্থিক সুবিধাও পুনরুদ্ধারের বাধ্যবাধকতা থাকে। সেই কারণেই বেতন-ভাতা ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। এটি আইনি প্রক্রিয়ার অংশ, কাউকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে নয়।
বিবৃতির শেষাংশে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, আইন, বিধিমালা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এ সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ও সুশাসন বজায় রাখতে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য বলেও উল্লেখ করা হয়।
এম জি