আধুনিক যুগের ‘ফেরাউন নেতানিয়াহু’, গাজা ইস্যুতে এরদোয়ানের বজ্রকণ্ঠ ও মুসলিম বিশ্বের নতুন সমীকরণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২, ২০২৬, ১১:১৪ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যখন বারুদের গন্ধে ভারী এবং গাজার মাটি যখন নিষ্পাপ শিশুদের রক্তে রঞ্জিত, তখন বিশ্ববিবেকের প্রতিনিধি হয়ে আবারও গর্জে উঠলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। 

ফিলিস্তিনের গাজায় মানবিক সহায়তা প্রদানকারী ৩৭টি আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ইসরায়েলি সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়ে এরদোয়ান সরাসরি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ইতিহাসের ঘৃণ্য চরিত্র ‘ফেরাউন’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। ২০২৬ সালের এই সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে এরদোয়ানের এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

শুক্রবার ইস্তাম্বুলের ঐতিহাসিক এক মসজিদে জুমার নামাজ আদায় শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। গাজা সংকটের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। 

তিনি বলেন, গাজায় আজ যা ঘটছে তা কেবল যুদ্ধ নয়, বরং তা একবিংশ শতাব্দীর নিকৃষ্টতম গণহত্যা। নেতানিয়াহু সরকার গাজার শিশুদের তাবু ও কন্টেইনার পর্যন্ত পৌঁছাতে দিচ্ছে না।

এরদোয়ান বলেন, "আজকের এই নিষ্ঠুরতা ফেরাউনের আমলকেও হার মানিয়েছে। গাজার ক্ষুধার্ত শিশুদের আর্তনাদ আজ আরশের মালিক শুনছেন, আর এই জালিম নেতানিয়াহুই আধুনিক যুগের ফেরাউন।"

নতুন বছরের প্রথম দিনে অর্থাৎ ১ জানুয়ারি ইসরায়েল সরকার গাজায় কর্মরত ৩৭টি আন্তর্জাতিক সংস্থার লাইসেন্স বাতিল করে। এই তালিকায় বিখ্যাত চিকিৎসা সেবা প্রদানকারী সংস্থা ‘ডক্টর্স উইদাউট বর্ডারস’ বা ‘সীমানাহীন চিকিৎসক দল’-ও রয়েছে। 

ইসরায়েলি প্রশাসনের দাবি, এই সংস্থাগুলো ত্রাণের আড়ালে হামাসকে সহায়তা করছে। তবে এমন অভিযোগের স্বপক্ষে কোনো তথ্যপ্রমাণ এখন পর্যন্ত বিশ্ববাসীর সামনে আনতে পারেনি দেশটি। এরদোয়ান এই পদক্ষেপকে ‘মানবিক অপরাধ’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, গাজার মানুষকে তিলে তিলে মেরে ফেলার এটি একটি সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা।

নেতানিয়াহুর এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ কেবল বাইরে নয়, খোদ ইসরায়েলের ১৯টি মানবাধিকার সংস্থাও এর নিন্দা জানিয়েছে। ‘আদালাহ’ সহ শীর্ষস্থানীয় এই সংস্থাগুলো এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, ত্রাণ কর্মীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে গাজায় দুর্ভিক্ষের প্রকোপ চরম আকার ধারণ করবে। তারা সরকারকে দ্রুত এই হঠকারী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছে। 

গাজার বর্তমান প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বৈরী আবহাওয়ার কথা স্মরণ করে এরদোয়ান বলেন, কাদা, বৃষ্টি আর হাড়কাঁপানো শীতের মধ্যে আজ গাজার শিশুদের কান্নার কোনো প্রতিধ্বনি নেই। আমরা তাদের জন্য কন্টেইনার পাঠাতে চাই, থাকার জায়গা করে দিতে চাই, কিন্তু এই ফেরাউন তা আটকে দিচ্ছে। 

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ইনশাআল্লাহ একদিন এই মজলুম মানুষগুলো এই জুলুম থেকে মুক্তি পাবে এবং তুরস্ক সেই মুক্তির মিছিলে অগ্রভাগে থাকবে। এ বিষয়ে তুরস্কের কূটনৈতিক তৎপরতায় নিয়োজিত শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ হলেন, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রেসিডেন্সিয়াল দপ্তরের উপদেষ্টা মন্ডলী।

বৃহস্পতিবার ইস্তাম্বুলের গালাতা সেতুতে অনুষ্ঠিত হওয়া লক্ষাধিক মানুষের জনসমাবেশকে স্বাগত জানিয়েছেন এরদোয়ান। তিনি মনে করেন, এই সমাবেশ প্রমাণ করে ফিলিস্তিনিরা একা নয়। তুরস্ক কেবল মৌখিক প্রতিবাদেই সীমাবদ্ধ নেই; ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে দেশটি ইসরায়েলের সাথে বাণিজ্যিকভাবে দূরত্ব বজায় রাখছে। ইতিপূর্বে ১০০০টিরও বেশি পণ্য রপ্তানি নিষিদ্ধ করার পর বর্তমানে তুরস্ক ইসরায়েলের সাথে সকল প্রকার আমদানি, রপ্তানি এবং ট্রানজিট বাণিজ্য স্থগিত করে রেখেছে।

প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান তাঁর বক্তব্যে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা বা ওআইসি এবং ইসলামি বিশ্বের দেশগুলোকে আরও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি মনে করেন, তুরস্কের একা লড়াই করার চেয়ে পুরো মুসলিম বিশ্ব একজোট হয়ে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করলে নেতানিয়াহুর দাম্ভিকতা চূর্ণ হতে বাধ্য। তুরস্ক গাজার মানুষের অধিকার আদায়ে তাঁদের শেষ শক্তি দিয়ে পাশে থাকবে বলে তিনি আবারও পুনর্ব্যক্ত করেন। 

রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ‘ফেরাউন’ মন্তব্যটি কেবল একটি উপমা নয়, বরং এটি ইসরায়েলের চলমান নৃশংসতার প্রতি তুর্কি জনগণের তীব্র ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন দ্বিধাবিভক্ত, তখন এরদোয়ানের এই আপসহীন অবস্থান ফিলিস্তিনিদের মনে আশার আলো জাগাচ্ছে। ইতিহাসের পাতায় ফেরাউনের যেমন পতন হয়েছিল, গাজার নিষ্পাপ শিশুদের আর্তনাদে নেতানিয়াহুরও তেমন পতন ঘটবে, এই বার্তাই পৌঁছে দিলেন আধুনিক তুরস্কের এই নেতা।

ইএইচ