তভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ইতিহাসে যোগ হলো এক অভূতপূর্ব ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। দক্ষিণ আমেরিকার তেলসমৃদ্ধ দেশটির দীর্ঘদিনের শাসক নিকোলা মাদুরো এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে।
শনিবার ভোরে রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ‘ডেল্টা ফোর্স’-এর এক ঝটিকা অভিযানে মাদুরো এবং তাঁর প্রভাবশালী স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তাঁদের সুরক্ষিত দুর্গ থেকে আটক করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানকে 'চমৎকার এবং নিখুঁত' বলে অভিহিত করেছেন।
এই ঘটনা কেবল ভেনেজুয়েলা নয়, বরং পুরো বিশ্ব রাজনীতিতে এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক কম্পন সৃষ্টি করেছে। রাশিয়ার তীব্র নিন্দা, ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনীর প্রতিরোধের ঘোষণা এবং যুক্তরাষ্ট্রের তেল শিল্পে আধিপত্য বিস্তারের সরাসরি ইঙ্গিত সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন বারুদঠাসা।
শনিবার ভোরের আলো ফোটার আগেই কারাকাসের আকাশ কেঁপে ওঠে মার্কিন যুদ্ধবিমান এবং হেলিকপ্টারের গর্জনে। সিবিএস নিউজ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন সেনাবাহিনীর শীর্ষ সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট 'ডেল্টা ফোর্স' এই অভিযানে নেতৃত্ব দেয়।
কারাকাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কমপ্লেক্স 'ফুয়ের্তে তিউনা' এবং 'লা কারলোটা' বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালানো হয়। জানা গেছে, ফুয়ের্তে তিউনা ঘাঁটিটি ছিল মাদুরোর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, মাদুরোকে একটি সুরক্ষিত দুর্গ থেকে আটক করা হয়েছে।
অভিযানের মূল পয়েন্টগুলো:
মাদুরোকে আটকের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কণ্ঠে ছিল চরম আত্মবিশ্বাস। তিনি জানান, এক সপ্তাহ আগে তিনি ব্যক্তিগতভাবে মাদুরোর সঙ্গে কথা বলেছিলেন এবং তাঁকে সরাসরি আত্মসমর্পণের আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন।
ট্রাম্প বলেন, এটি ছিল একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। আমি তাকে বলেছিলাম, আপনাকে হার মানতে হবে। অভিযানে মাদুরো দম্পতির শারীরিক অবস্থা ভালো আছে বলে জানালেও ট্রাম্প মনে করিয়ে দেন, তারা অনেক মানুষ হত্যা করেছে, এটা ভুলে গেলে চলবে না।
এই অভিযানের পেছনে কেবল মাদুরোর বিরুদ্ধে থাকা মাদক পাচার বা দুর্নীতির মামলাই নয়, বরং বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থ যে জড়িয়ে আছে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন ট্রাম্প নিজেই। ট্রাম্প সরাসরি ঘোষণা করেছেন যে, ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে যুক্ত হবে।
তিনি বলেন, আমাদের কাছে বিশ্বের সেরা এবং সবচেয়ে বড় তেল কোম্পানি আছে। আমরা ভেনেজুয়েলার এই তেল সম্পদের ব্যবস্থাপনায় সরাসরি থাকব। এই বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে, আগামী দিনগুলোতে ভেনেজুয়েলার খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ওয়াশিংটনের হাতেই থাকতে যাচ্ছে।
মাদুরোকে আটকের এই ঘটনাকে 'একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের অগ্রহণযোগ্য লঙ্ঘন' হিসেবে অভিহিত করেছে রাশিয়া। ক্রেমলিন এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যে অজুহাতে এই হামলা চালানো হয়েছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
রাশিয়া অবিলম্বে পরিস্থিতির স্বচ্ছতা দাবি করেছে এবং ভেনেজুয়েলার জনগণের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জানিয়েছেন, এই অভিযানে ব্রিটেন জড়িত নয়। তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং আরও তথ্য পাওয়ার পর মন্তব্য করবেন বলে জানান।
মাদুরো আটকের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কারাকাস জুড়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে। ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ এই হামলাকে দেশের ইতিহাসে 'সবচেয়ে বড় অপমান' বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বিদেশি সেনাদের প্রতিরোধ করার অঙ্গীকার করেছেন।
অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান গিল দাবি করেছেন যে, মাদুরো এখনো সাংবিধানিকভাবে দেশটির প্রেসিডেন্ট। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত করেন। কারাকাসের রাস্তায় মাদুরোর সমর্থকদের জাতীয় পতাকা হাতে বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে, আবার অনেক সাধারণ মানুষকে মার্কিন বিমান হামলার আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে দেখা গেছে।
নিকোলা মাদুরোর বিরুদ্ধে ২০২০ সাল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার এবং দুর্নীতির মামলা রয়েছে। মার্কিন বিচার বিভাগ তাঁর মাথার দাম ৫ কোটি ডলার ঘোষণা করেছিল। রিপাবলিকান সিনেটর মাইক লি এবং মার্কো রুবিও নিশ্চিত করেছেন যে, মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হচ্ছে ফৌজদারি অপরাধের বিচারের মুখোমুখি করার জন্য। নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট ফেডারেল আদালতে এই বিচার প্রক্রিয়া চলবে।
মাদুরো অপসারিত হওয়ার পর ভেনেজুয়েলার ক্ষমতা কার হাতে যাবে, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী, ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের হাতে ক্ষমতা যাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ দিন ধরে বিরোধী দলীয় নেতা এডমুন্ডো গঞ্জালেসকে বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে সমর্থন দিয়ে আসছে। ফলে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখন একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই "বড় আকারের হামলা" এবং মাদুরোকে আটকের ঘটনা ল্যাটিন আমেরিকার রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করল। একদিকে সামরিক শক্তির আস্ফালন এবং অন্যদিকে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতৃত্বের পরিবর্তন এই দুইয়ের মাঝে পড়ে ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ এখন কোন দিকে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে ট্রাম্পের আসন্ন সংবাদ সম্মেলন থেকে হয়তো এই অভিযানের আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসবে।