ইরানজুড়ে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন এখন এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নিয়েছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা এই গণবিক্ষোভ দমনে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মারমুখী অবস্থান গ্রহণ করায় নিহতের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
রাজধানী তেহরানের হাসপাতালগুলোতে গুলিবিদ্ধ লাশের ভিড় এবং সরকারের পক্ষ থেকে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার প্রচ্ছন্ন হুমকিতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। শনিবার রাতেও ইরানের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সম্মুখ সংঘর্ষ হয়েছে।
এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেই বিক্ষোভকারীদের চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মোভাহেদি আজাদ। তিনি এক বিবৃতিতে কঠোর ভাষায় ঘোষণা করেছেন, যাঁরা রাজপথে বিক্ষোভ করছেন এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন, তাঁদের আল্লাহর শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
উল্লেখ্য, ইরানের ইসলামি আইনে আল্লাহর শত্রু বা মুহাজিব হিসেবে কেউ দোষী সাব্যস্ত হলে তার জন্য আইনত মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। সরকারের এই ঘোষণা আন্দোলনকারীদের মধ্যে ভীতি সঞ্চারের পরিবর্তে ক্ষোভের আগুনে আরও ঘি ঢেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিক্ষোভের ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এর এক প্রতিবেদনে। তেহরানের চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে যে, রাজধানীর মাত্র ছয়টি হাসপাতালেই অন্তত ২১৭ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর রেকর্ড পাওয়া গেছে।
হাসপাতাল সূত্রগুলো বলছে, নিহতদের প্রায় সবাই সরাসরি গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। অনেক হাসপাতালে আহতদের ভিড় এত বেশি যে সাধারণ চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। গত তিন দিনে সারা দেশে নিহতের মোট সংখ্যা কয়েক শ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদ থেকে এই বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল।
শুরুতে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং ডিমসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দামের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানেই এই অর্থনৈতিক আন্দোলন রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহ করে। এখন বিক্ষোভকারীদের স্লোগানে কেবল রুটি রুজির কথা নেই, বরং তারা সরাসরি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বর্তমান শাসনব্যবস্থা বা ধর্মতন্ত্রের অবসানের দাবি তুলছে। তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পোস্টার ছিঁড়ে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে।
ইরানের এই গণজাগরণ এখন আর দেশের ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। গতকাল পশ্চিম লন্ডনে অবস্থিত ইরান দূতাবাসের সামনে কয়েক শ বিক্ষোভকারী সমবেত হয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বিক্ষোভকারীরা দূতাবাস প্রাঙ্গণে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করেন এবং একজন সাহসী আন্দোলনকারী ভবনের বারান্দায় উঠে ইরানের বর্তমান পতাকা নামিয়ে ফেলেন। এ ঘটনায় লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং নিরাপত্তা জোরদার করেছে। এ ছাড়া প্যারিস, বার্লিন এবং ওয়াশিংটনেও প্রবাসী ইরানিরা সংহতি সমাবেশ করছেন।
ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প এই আন্দোলনকে বিপজ্জনক হিসেবে অভিহিত করে বিক্ষোভকারীদের সহায়তার ইঙ্গিত দিয়েছেন। অন্যদিকে ইরান সরকার এই বিক্ষোভের পেছনে বিদেশি ইন্ধন রয়েছে বলে দাবি করছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইরানের এই দমনপীড়নের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
তারা বলছে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সরাসরি গুলি চালানো এবং বিচারহীনভাবে মৃত্যুদণ্ডের ভয় দেখানো আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। বর্তমানে তেহরানের ৬টি হাসপাতালেই ২১৭ জনের বেশি রেকর্ডভুক্ত মৃত্যু হয়েছে এবং সারা দেশে এই সংখ্যা কয়েক শ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিক্ষোভকারীদের আল্লাহর শত্রু ঘোষণা ও মৃত্যুদণ্ডের বিধান প্রয়োগের হুমকির মুখে আন্দোলনকারীরা এখন অর্থনৈতিক সংস্কার থেকে শুরু করে সরাসরি শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছে।
জেএইচআর