ইরানের অস্থিরতা ও ইসরায়েলের দ্বিধা, কৌশলগত সময়ের খেলায় কে জিতছে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশিত: জানুয়ারি ১২, ২০২৬, ০২:১৩ পিএম

ইরানের রাজপথে চলমান বিক্ষোভ এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাকে পশ্চিমা বিশ্ব সাধারণত একটি শাসনব্যবস্থার পতনের সংকেত হিসেবে দেখে থাকে। কিন্তু বৈশ্বিক রাজনীতির গভীরে তাকালে এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক মূল্যায়নগুলো বিশ্লেষণ করলে এক ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে। 

ইরানের এই নিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলা আসলে ইসরায়েলের জন্য এক বিশাল কৌশলগত ফাঁদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা তেহরানকে দিচ্ছে মূল্যবান সময় এবং ইসরায়েলকে ফেলছে গভীর অনিশ্চয়তায়। ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে রয়েছে যাকে সামরিক বিশেষজ্ঞরা নিরাপত্তা ধূসর অঞ্চল হিসেবে অভিহিত করছেন। দেশটি পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়, আবার এটি পতনের দ্বারপ্রান্তেও নেই। এই মাঝামাঝি অবস্থা তেহরানের জন্য একটি ঢাল হিসেবে কাজ করছে।

ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের ২০২৫ সালের একটি নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমান এই কূটনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ, এই অস্থিতিশীলতার আড়ালে ইরান বিশ্ব সম্প্রদায়ের নজর এড়িয়ে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক ও সামরিক অবকাঠামো পুনর্গঠনের সুযোগ পাচ্ছে।

তেল আবিবের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা এখন এক চরম মনস্তাত্ত্বিক সংকটে ভুগছেন। প্রথাগত সামরিক যুক্তি বলে, প্রতিপক্ষ যখন পুনর্গঠিত হচ্ছে, তখন তার ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ বা আগাম হামলা চালানো উচিত। কিন্তু ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ এই হিসাবকে উল্টে দিয়েছে। ইসরায়েলি বিশ্লেষক রন বেন ইশাইয়ের মতে, বিক্ষোভ চললেও ইরানি ক্ষমতাকাঠামো এখনো অটুট। এই অবস্থায় ইসরায়েল যদি হামলা চালায়, তবে হিতে বিপরীত হতে পারে। 

আট বছরব্যাপী ইরান ইরাক যুদ্ধের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, যেকোনো বিদেশি হামলা ইরানের খণ্ডিত জনগোষ্ঠীকে জাতীয়তাবাদী আবেগে পুনরায় ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। ফলে ইসরায়েলি হামলা কেবল বিক্ষোভের গতিপথই বদলে দেবে না, বরং সরকারকে ভিন্নমত দমনের এক বৈধ অজুহাত এনে দেবে। ইরানের জন্য এখন সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো সময়। 

ইসরায়েল যখন হামলার উপযুক্ত মুহূর্ত নিয়ে ভাবছে, তেহরান তখন সেই সময়কে ব্যবহার করে রাশিয়ার সাথে পারমাণবিক সহযোগিতা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। গোয়েন্দা নজরদারি যখন রাজপথের বিক্ষোভকারীদের দমনে ব্যস্ত থাকার নাটক দেখছে, পর্দার আড়ালে ইরানি প্রযুক্তিবিদেরা তাদের সেন্ট্রিফিউজ উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন। এই সময় তৈরির রাজনীতিই তেহরানকে ইসরায়েলের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে রেখেছে।

ইরানি কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে তাদের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার জন্য মোসাদ বা বিদেশি শক্তির ষড়যন্ত্রকে দায়ী করছেন। এর পেছনে একটি দ্বিমুখী লক্ষ্য রয়েছে। প্রথমত, এটি দেশের অভ্যন্তরে বিক্ষোভকে বিদেশি এজেন্ডা হিসেবে তকমা দিয়ে দমন করার পথ পরিষ্কার করে। দ্বিতীয়ত, এটি আন্তর্জাতিক পরিসরে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পাল্টা আঘাত হানার একটি বৈধ ভিত্তি তৈরি করে। 

তেহরান প্রচার করছে যে, ইসরায়েল যেহেতু তাদের দেশে অস্থিতিশীলতা ছড়াচ্ছে, তাই আত্মরক্ষার খাতিরে ইসরায়েলের ওপর আঘাত হানা তাদের অধিকার। ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের প্রক্সি শক্তিগুলো যেমন হিজবুল্লাহ বা হামাস আগের চেয়ে কিছুটা দুর্বল হলেও তেহরান এখন অসম পুনর্গঠন কৌশলে মনোযোগ দিচ্ছে। 

তারা এখন আর কেবল মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং পারমাণবিক সীমারেখা বজায় রাখাকেই শ্রেষ্ঠ প্রতিরক্ষা মনে করছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলোও এখন সরাসরি হামলায় যেতে অনিচ্ছুক; তারা অপেক্ষা করছে পরিস্থিতি কোন দিকে যায় তা দেখার জন্য। এই অপেক্ষার রাজনীতি মূলত তেহরানের পাল্লাকেই ভারী করছে।

ইরান অত্যন্ত সুকৌশলে নিষ্ক্রিয়তার বোঝাটি তেল আবিবের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে। আগে ইসরায়েল ছিল আক্রমণাত্মক ও উদ্যোগী, আর এখন তারা বিভ্রান্ত। ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপকে এমন এক অনিশ্চিত জায়গায় নিয়ে ঠেকিয়েছে, যেখানে যুদ্ধ সম্ভব হলেও তার ঝুঁকি ইসরায়েলের জন্য অসহনীয়। 

পরিশেষে বলা যায়, তেহরানের রাজপথের অস্থিরতা ইসরায়েলের জন্য সুযোগ নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত জটিলতা তৈরি করেছে। এই ধূসর পরিসর ব্যবহার করে ইরান নিজেকে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু থেকে সরিয়ে পুনর্গঠনের এক নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে গেছে। সামগ্রিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইরান অস্থিরতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সামরিক পুনর্গঠন চালাচ্ছে। 

ইসরায়েল এখন দ্বিধায় আছে যে হামলা করলে ইরানিদের মধ্যে জাতীয়তাবাদ চাঙ্গা হবে, আবার না করলে তাদের শক্তি বাড়বে। মূলত ইসরায়েলের মনোযোগ রাজপথের বিক্ষোভে নিবদ্ধ রেখে ইরান পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে, যার ফলে যুদ্ধের সমীকরণ এখন ইসরায়েলের জন্য অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

জেএইচআর