ইরানের রাজপথে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা চরম অস্থিরতা ও ‘সহিংস দাঙ্গায়’ বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যুর পর দেশটিতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক শুরু হয়েছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, সাম্প্রতিক দাঙ্গায় নিহত ইরানিদের স্মরণে প্রেসিডেন্ট ও তাঁর মন্ত্রিসভা সম্মিলিতভাবে শোক পালন করছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম’ এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
ইরান সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, পশ্চিমা মদদপুষ্ট বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি উস্কানিতে শুরু হওয়া এই সহিংসতায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের ‘শহীদ’ হিসেবে শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানি জাতি দেখছে কীভাবে অপরাধীরা দাউশ বা আইএসের মতো বর্বরতা চালিয়ে সাধারণ মানুষ, বাসিজ স্বেচ্ছাসেবক এবং পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করেছে। তাঁদের অকাল মৃত্যুতে দেশ আজ শোকাতুর।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থাগুলোর দাবি, এই বিক্ষোভ এখন আর কেবল সাধারণ দাবি-দাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একে ‘নজিরবিহীন দাঙ্গা’ আখ্যা দিয়ে সরকার বলছে, রাজতন্ত্রপন্থি দাঙ্গাকারীরা দেশের বিভিন্ন শহরে সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা ভাঙচুর করেছে। দাঙ্গাকারীরা সড়ক অবরোধ, প্রশাসনিক ভবন ও পুলিশ স্টেশনে হামলা চালিয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সরকারি ভাষ্যমতে, এই বিশৃঙ্খলার পেছনে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন রয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে ইরানে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে কয়েকশ বিক্ষোভকারী প্রাণ হারিয়েছেন। নরওয়েভিত্তিক সংস্থা ‘ইরান হিউম্যান রাইটস’ এবং ‘এইচআরএএনএ’-এর তথ্যমতে, নিহতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, ইরান সরকার জানিয়েছে যে, ১০০ জনেরও বেশি নিরাপত্তা কর্মী দাঙ্গাকারীদের হামলায় শহীদ হয়েছেন। তেহরানসহ বড় বড় শহরগুলোতে ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন থাকায় হতাহতের প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
রোববার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করেছেন যে, তাঁর সরকার জনগণের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে প্রস্তুত। তবে ‘দাঙ্গাবাজদের’ কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। এদিকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসায় খুব শিগগিরই দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা পুনরায় চালু করা হবে।
ইরানের এই অস্থির পরিস্থিতি নিয়ে মুখ খুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর বলপ্রয়োগ বন্ধ না হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। এর জবাবে তেহরানও পালটা হুঙ্কার দিয়ে জানিয়েছে, যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে। জার্মান চ্যান্সেলরসহ বিশ্বনেতারাও ইরানে চলমান নৃশংসতার নিন্দা জানিয়েছেন।
ইরানে বর্তমানে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট বিরাজ করছে। রাষ্ট্রীয় এই শোক ঘোষণার মাধ্যমে সরকার একদিকে যেমন নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করছে, অন্যদিকে দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের চেষ্টাও চালাচ্ছে। সাধারণ ইরানিরা এখন শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসার অপেক্ষায় দিন গুনছেন।
এএন